তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: নারী নির্যাতন, ধর্ষণ রোধ, পণপ্রথার বিরুদ্ধে এবং সকলের জন্য শিক্ষার দাবিতে ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করার উদ্দেশ্যে সাইকেলে চেপে দিল্লি যাত্রা শুরু করলেন বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড় এলাকার সংগ্রামপুর গ্রামের বাষট্টি বছরের ‘তরুণ’ শ্যামাপদ প্রামানিক৷

শুক্রবার ‘আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে’র সকালে বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রাজ্য সড়কের উপর জামবেদিয়া মোড়ে এই ‘সাইকেল যাত্রা’র সূচনা করেন বড়জোড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কাজল পোড়েল, পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ বাপন তেওয়ারি, বেলিয়াতোড় থানার ওসি আব্দুর সামাদ আনসারি সহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ৷

হঠাৎ এই বয়সে সাইকেলে চেপে দিল্লি যাত্রার উদ্দেশ্য কি? শ্যামাপদ প্রামানিকের কাছে এই প্রশ্ন রাখতেই তিনি বলেন,‘‘বয়সটা কোন বিষয়ই নয়৷ অঙ্কের হিসেবে বয়স বাড়লেই মনে-প্রাণে আমি আজও তরুণ৷ আর এই সাইকেল যাত্রা আমার হঠাৎ নয়৷ এর আগে ‘পণ প্রথা, নারী নির্যাতন, ধর্ষণের মতো অতি জঘন্য বিষয় রোধের পাশাপাশি সকলের জন্য শিক্ষার দাবিতে ২০১১, ২০১৫-১৬ সালে এই সাইকেলে চেপেই সারা রাজ্য ভ্রমণ করেছি৷ সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়ে সচেতনতার বীজ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি৷ এবার সেই লক্ষ্যেই সাইকেলে চেপে দিল্লি যাত্রা৷’’ তিনি বলেন, ‘‘দেখা করার চেষ্টা করবেন দেশের মাননীয় রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও৷’’

শ্যামাপদ প্রামানিক কলকাতা24×7 কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন,‘‘ ১৯৭৩ সালে স্থানীয় দধিমুখা হাইস্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর অর্থাভাবে আর পড়াশুনা করা হয়নি৷ পড়াশুনা করতে না পারার যন্ত্রণা তখন থেকেই কুরে কুরে খায়৷’’ পরের বছর ১৯৭৪ সাল থেকেই সমাজসেবায় পুরোপুরি নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি৷ নিজ উদ্যোগে গরিব খেতমজুর পাড়ায় প্রতিটি সন্ধ্যায় লন্ঠনের আলোতে নিয়ম করে পড়িয়েছেন তাদের শিশু সন্তানদের৷ পরে ১৯৯০-৯১ সালে রাজ্যে শুরু হওয়া সাক্ষরতা আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক তিনি৷ তখন থেকে আজও তাঁর ‘সাক্ষরতা কেন্দ্র’ একদিনের জন্য বন্ধ হয়নি৷

কথা প্রসঙ্গে শ্যামাপদ বাবু আরও জানালেন, স্ত্রী বেলা প্রামানিক ও তিনি নিজে মরণোত্তর চক্ষুদানে অনেক আগেই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন৷ মৃত্যুর পর তাঁর চোখ দিয়ে কেউ এই পৃথিবীর আলো দেখবে এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি৷

সারা জীবনধরে এই ধরণের সামাজিক কাজ ও সমাজ সচেতনতার উদ্দেশ্যে সাইকেলে দিল্লি যাত্রা৷ এবিষয়ে পরিবারের ভূমিকা কি? তাঁরা কি একাজে কোনদিন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন না কি আপনাকে উৎসাহিত করেছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ‘চির তরুণ’ শ্যামাপদ প্রামানিক বলেন, ‘‘এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না৷ তাদের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া এই কাজে আমি নামতেও পারতামনা৷’’ স্ত্রী, দুই পুত্র-পুত্রবধূ-মেয়ে-জামাই ও নাতী-নাতনীদের পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতাই এই কাজে অন্যতম অনুপ্রেরণা বলে তিনি জানিয়েছেন৷ একই সঙ্গে এলাকার প্রতিটি মানুষ ও বেলিয়াতোড় থানার ওসি আব্দুস সামাদ আনসারি, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কাজল পোড়েল ‘দিল্লি যাত্রা’য় প্রভূত সাহায্য করেছেন বলে তিনি জানান৷

শ্যামাপদ প্রামানিকের বড় ছেলে একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত বিকাশ কুসুম প্রামানিক বলেন, ‘‘বাবার এই কাজকে আমরা ‘স্যালুট’ করি৷ ছোটো থেকেই আমরা তিন ভাইবোন বাবার এই ভূমিকাটা দেখতেই অভ্যস্ত৷ বাধা দিইনি বরং উৎসাহিতই করেছি৷ তবে এবার সাইকেলে দিল্লি যাত্রার বিষয়ে মৃদু আপত্তি করেছিলাম৷ কারণ বাবার বয়স এই মুহূর্তে বাষট্টি৷ তাছাড়া ওনার হাঁপানি রয়েছে৷ প্রায় কুড়ি দিনের এই ধকল সহ্য করা সহজ নয়৷ সে কথা ভেবেই আমরা দিল্লিযাত্রা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলাম৷ কিন্তু উনি যখন বললেন, বহু দিনের ইচ্ছা সাইকেলেই যাবো৷ যে বিষয়গুলি নিয়ে সারা জীবন লড়াই করে এসেছি তা নিয়ে পথে যেতে যেতে সাধারণ মানুষের সচেতনতার প্রসার ঘটাতে চাই৷ তখন আর আপত্তি করিনি৷ বরং উৎসাহিতই করেছি৷’’

জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে শ্যামাপদ প্রামানিকের একক উদ্যোগে এই ‘সাইকেলে দিল্লি যাত্রা’কে সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছেন৷ এই বয়সে তাঁর এই উদ্যোগ অভাবনীয় বলে মনে করছেন অনেকে৷ বড়জোড়া এলাকার একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক ও সম্পাদক-সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, শ্যামাপদ বাবুর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। বাষট্টি বছর বয়সে পৌঁছেও নানান বাধা অতিক্রম করে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। যা আগামী প্রজন্মের দৃষ্টান্তস্বরূপ।

বড়জোড়া পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি কাজল পোড়েল এ বিষয়ে বলেন, শ্যামাপদ বাবুর মতো মানুষ বড়জোড়া ব্লক এলাকার গর্ব। তিনি যে সামাজিক সমস্যাগুলি নিয়ে লড়ছেন সে বিষয়ে তাঁর সাথে আমরাও আছি। এই মুহূর্তে আমাদের সমাজে ওনার মতো মানুষের ভীষণ প্রয়োজন। দিল্লি যাত্রার সাফল্য কামনা করি। একই সঙ্গে আগামী দিনে যেকোনো প্রয়োজনে বড়জোড়া পঞ্চায়েত সমিতি তাঁর পাশে থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন৷