দেবময় ঘোষ, কলকাতা: ‘‘জন্মদিন! বলেন কী? খেয়াল ছিল না৷’’ ইন্দিরা ভবনের গেটের বাইরে আউটপোস্টে বসা পুলিশকর্মী পাশের সহকর্মীর দিকে তাকালেন৷ পাশের পুলিশ অবশ্য রাখঢাক না রেখে বলেই ফেললেন, ‘‘ইন্দিরা ভবনে জ্যোতিবাবুর কোনও ছবি নেই৷ কিস্সু নেই …৷ এখানে অনেকদিন জন্মদিন হয় না৷ ’’ সোমবার, ৮ জুলাই৷ রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ১০৬ তম জন্মদিন৷ জন্মদিনে জ্যোতিবাবুর স্মৃতিমাখা ইন্দিরা ভবনে যেন এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা৷ মনে পড়ছিল, ২০১০ সালের আগে বেশ কিছু – ‘৮ জুলাই৷’ প্রতি ৮ জুলাই সুভাষ-জায়া রমলা চক্রবর্তীর সংস্থা ‘পথের পাঁচালী’র বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাঝেই বাইরে এসে হাত নাড়তেন অশীতিপর কমরেড৷ বসতেন চেয়ারে৷ দেখতেন, ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান৷  

‘কমরেড জ্যোতি বসু’র জন্মদিন পালন করতে গিয়েও হাজারো প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে তৎকালীন রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীকে৷ জবাবে, সুভাষ কখনও বলেছেন ‘জীবন্ত কিংবদন্তী’র জন্মদিন পালন করা তাঁর সৌভাগ্য৷ আবার কখনও বলেছেন, জ্যোতিবাবু তাঁর অভিভাবক, রাজনৈতিক গুরু৷ তাঁর ক্যাপ্টেন৷ পার্টির একাংশের আপত্তি উড়িয়ে সুভাষ জ্যোতিবাবুর জন্মদিন পালনে তবুও পিছু হঠেননি৷ ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি থেমে যান জ্যোতি বসু৷ যদিও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে চেয়ার ছেড়েছিলেন ২০০০ সালের নভেম্বরেই, তবে আমৃত্যু তিনিই ছিলেন সেই-সময়ে দেশের সর্বাধিক ক্ষমতায় থাকা মুখ্যমন্ত্রী৷

ইন্দিরা ভবনের আউটপোস্টে বসা পুলিশকর্মীদের এইসব তথ্য অজানা নয়৷ এক পুলিশকর্মীর বক্তব্য, ‘‘ইন্দিরা ভবন তো একটা গেস্ট হাউস৷ তবে জীবনের একটা বড় অংশ জ্যোতিবাবু এখানে কাটিয়েছেন৷ সত্যিই খারাপ লাগে যখন দেখি এখানে ওর কিছুই নেই৷ এখন এখানে কমিশন বসেছে৷ সরকারি কাজকর্ম হয়৷’’ – হাত দিতে বাইরের বোর্ডের দিকে ইঙ্গিত করলেন ওই পুলিশকর্মী৷ ইন্দিরা ভবনের গেটের ডানদিকে এবং বাঁ-দিকে দুটি করে মোট চারটি বোর্ড ঝুলছে৷ প্রতিটি-ই তদন্ত কমিশন৷ বিচারপতি অমিতাভ লালা কমিশন, বিচারপতি ডি পি সেনগুপ্ত কমিশনের বোর্ড ঝুলছে একদিকে৷ অন্যদিকে, একটু দূরেই রয়েছে বিচারপতি এন এন ভট্টাচার্য এবং রণেন্দ্র নারায়ণ রায় কমিশন৷

রাস্তায় এক ট্রাফিক পুলিশ ইন্দিরা ভবনের সামনের যান চলাচল নিত্য খেয়াল রাখেন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘দুটি কমিশনের কাজ এখনও চলছে৷ বিচারপতিরা প্রায় দিনই আসেন৷ তবে বাকি দুটি কমিশনের খবর বলতে পারবো না৷’’ তবে পুলিশকর্মীদের থেকে ইন্দিরা ভবনের বাগানের খবর পাওয়া গেল৷ এক সময় জ্যোতিবাবুর স্ত্রী কমল বসু নিজে হাতেই ওই বাগান করতেন৷ মালিদের নির্দেশও দিতেন৷ ইন্দিরা ভবনের গেটের বাইরে থেকে এক টুকরো বাগান দেখা গেল৷ ফুটে রয়েছে হলুদ গাঁদা ফুল৷ পুলিশের খবর, সরকারি দফতর থেকে মালিদের নিয়োগ করেছে৷ তারা এসে নিয়মিত বাগানের যত্ন নেন৷

শোনা যায় জীবনের শেষ কয়েকটা দিন জ্যোতিবাবু ইন্দিরা ভবনে ফিরতে চাইতেন৷ আমরি হাসপাতালে বন্দি থাকতে চাইতেন না৷ পুত্র চন্দন বসু এবং পুত্রবধু রাথী তাঁকে সল্টলেকের এফ ডি ব্লকের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে চাইলেও তিনি যেতে চাননি৷ মন থেকে ভালো বাসতেন এই বাড়িকে৷ এই বাড়িতেই তাঁর সঙ্গে দেখা করে গিয়েছেন অনেকেই, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়, প্রণব মুখোপাধ্যায় থেকে দিয়োগো মারাদোনা৷ তৃণমূল নেত্রী হিসাবে এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও৷

দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নাম অনুসারে ভবনটিতে ইন্দিরা নিজেই এসেছিলেন ১৯৭২ সালে৷ এআইসিসি-এর বৈঠক চলছিল কলকাতায়৷ টানা এক সপ্তাহ ওই বাড়িতেই ছিলেন ইন্দিরা৷ পরবর্তীকালে,তখন জ্যোতিবাবুর হিন্দুস্তান পার্কের বাড়ি থেকে ১৯৮৬ সালে তিনি চলে আসেন রাজভবনে৷ চিকিৎসকরা মুখ্যমন্ত্রীকে কলকাতার কোলাহলের মাঝে কিছুটা প্রাকৃতিক পরিবেশে থাকতে বলেছিলেন৷ সেদিক থেকে রাজভবনই ছিল সেরা ঠিকানা৷

পড়ুন: ভয় পেলেও মানুষকে ‘রাম’ নাম করে, অমর্ত্য সেনকে জবাব তথাগতর

২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের পুরনো কিছু ঘটনার পুনরায় তদন্ত করতে চান মমতা৷ গঠিত হয় বেশ কিছু তদন্ত কমিশন৷ ইন্দিরা ভবনে কিছু কমিশনের দফতর চলে আসে৷ ইন্দিরা ভবনের নিরাপত্তায় যে ইএফআর জওয়ানরা সর্বদা মোতায়েন থাকতেন তারাও সরে যান৷ সামনে রাস্তা জোড়া লোহার ‘ফেনসিং’ খুলে ফেলা হয়৷ এরপর এদিন রাইটার্স থেকে বেরনোর সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দেন, ওই বাড়িতেই হবে কবি নজরুল মিউজিয়াম৷ তবে এটাও ঠিক, জ্যোতিবাবুর মৃত্যুর পর সিপিআইএম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি বাড়িটি তৎকালীন রাজ্য সরকারকেই ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন৷

সেই সময় রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী ছিলেন অশোক ভট্টাচার্য৷ অশোকবাবু পুরানো স্মৃতি ফিরে পেলেন – ‘‘আমরা ওর জন্য একটা ভালো বাড়ি খুঁজছিলাম৷ ১৯৮৯ সালে সল্টলেকে ইন্দিরা ভবনে আসেন উনি৷ কিন্তু একটা বিষয়ে খুব খারাপ লাগে৷ আমরা (বামফ্রন্ট সরকার) চেয়েছিলাম ইন্দিরা ভবন সংরক্ষিত করা হোক৷ কারণ ওখানেই থাকতেন জ্যোতি বসু৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার তা চাইলোই না৷ শুনেছিলাম ওই বাড়িতে নজরুল মিউজিয়াম হবে৷ তাও হয়নি৷ আমরা নিউটাউন-কে জ্যোতি বসু নগর করতে চেয়েছিলাম৷ মমতার সরকার বাধা দিয়ছে৷ নিউটাউনে জ্যোতি বসু গবেষণাগার এবং স্টাডি সেন্টার করার জমি চেয়ে ৫ কোটি টাকা দিয়েছিল৷ জমির দখলদারি পাইনি৷ এখন অন্য জমি দেখাচ্ছে৷ এদের আচরণ সত্যই দুঃখজনক৷’’ একদা বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ইন্দিরা ভবনে সাধারণ জনতার প্রবেশাধিকার ছিল না৷ শুধু ৮ জুলাই গেট খোলা থাকতো৷ আসতেন অনেকেই৷ সময় বদলেছে৷ সাদা ওই বাড়িটির রংও বদলেছে৷ ইন্দিরা ভবন এখন নীল সাদা৷