একটা সময় ছিল, যখন রাজ্যের বামফ্রন্টের নেতারা উত্তর থেকে দক্ষিণ, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ চষে বেড়াতেন৷ ব্যস্ততার মধ্যেই দিন-রাত কাটত৷ কিন্তু রাজ্যপাট হাতছাড়া হতেই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷ কেউবা নিজেকে আড়াল করে নিয়েছেন৷ কেউ করেছেন দলবদল৷ কিন্তু কিছু কমরেড এখন ঠিক কী করছেন? কী করে তাঁদের দিন কাটছে৷ সেই সব নিয়ে Kolkata24x7 এ বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন #কেমন_আছেন_কমরেড?

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য দপ্তর হেমন্ত বসু ভবন প্রবেশ পথের বাঁদিকেই লোকমত প্রকাশনের অফিস৷ আড়ম্বড়হীন, অমায়িক যে ভদ্রলোককে সেখানে সবসময় পাবেন, তিনি রাজ্যের প্রাক্তন ত্রাণ মন্ত্রী হাফিজ আলম সাইরানি৷ ফরওয়ার্ড ব্লকের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং সম্পাদক মণ্ডলীর এই সদস্য সারাদিন বইপত্র আর খবরের কাগজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন প্রচার বিমুখ হাফিজ৷ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি করেন৷ বললেন, ‘‘বেশ ভালোই আছি৷’’

এসএফআই থেকে দাদা রমজান আলীর হাত ধরে এসেছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লকে৷ ১৭ বছর বিধানসভার সদস্য হাফিজের নাম জুড়ে আছে গোয়ালপোখর বিধানসভা কেন্দ্রের সঙ্গে৷ ২০০৬ সালে পরাজিত হন কংগ্রেস প্রার্থী দীপা দাশমুন্সীর কাছে৷ হাফিজের দাদা রমজান আলী সোশ্যালিস্ট পার্টি করতেন৷ বিহারের কিষাণগঞ্জ থেকে পরবর্তীকালে চলে আসেন ইসলামপুরে৷ যুক্ত হন সিপিএমে৷ কিন্তু ১৯৬৯ সাল কানকিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য সিপিএম থেকে বহিস্কৃত হন রমজান আলি৷

তবে মানুষের ভালোবাসা থেকে বঞ্জিত হননি৷ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ১৭ জন প্রার্থীকে নির্দল হিসেবে নির্বাচনে হারিয়ে গোয়ালপোখরে জেতেন রমজান৷ হাফিজের কথায়, দাদাকে দলে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন স্বয়ং জ্যোতি বসু৷ কিন্তু তা সম্ভব হয়নি৷ মূলত তাঁর পরামর্শেই ফরওয়ার্ড ব্লকে আসেন রমজান৷

‘‘সেই সময় আমার বয়স ২৩-২৪ বছর৷ ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কলকাতার উমেশচন্দ্র কলেজেই এসএফএই করতাম৷ তারপর চাকুলিয়া স্কুলে ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে পড়াতে গিয়েছিলাম৷ ১৯৮২ সালে ফরওয়ার্ড ব্লকে চলে এলাম৷ ১৯৯৪ তে দাদা মারা গেলেন৷ পার্টি থেকে গোয়ালপোখর আসনের দায়িত্ব পেলাম আমি৷ ১৯৯৫ সালের উপনির্বাচনে গোয়ালপোখর আসন থেকে ৩৯ হাজার ভোটে জিতেছিলাম৷ ৯৫ থেকে ২০০১ পর্যন্ত টানা এমএলএ ছিলাম৷ ২০০১ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্ত্রীসভায় আমি ত্রাণমন্ত্রী৷’’ বলার মাঝে একবারও থামেননি হাফিজ৷

জ্যোতিবাবু কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাননি হাফিজ৷ তার জন্য একটু আফসোস তো আছেই৷ কিন্তু অশোক ঘোষের সঙ্গে একাধিকবার তিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলেন৷ টুকরো টুকরো স্মৃতিচারণ করলেন তিনি৷ ‘‘জ্যোতিবাবু পড়ে গিয়ে পায়ে চোট পেয়েছেন৷ কমরেড অশোক ঘোষ তাঁকে দেখতে গেলেন আমাকে সঙ্গে নিয়ে৷ অশোকদা জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কী জানতেন এতদিন ক্ষমতায় থাকবেন? জ্যোতিবাবু বললেন, যদি জানতাম এতদিন থাকবো তাহলে কী পে-কমিশন নিয়ে এই ভাবে সিদ্ধান্ত নিতাম? ওরা বলেছিল কী করা যাবে? আমি বললাম, সারা ভারত যা পাচ্ছে, তার থেকে ১ টাকা বেশি দেবেন৷ বাকিটা আপনারা বুঝে নিন৷’’

১৯৯৫ সাল৷ বিধানসভাতে অনাস্থা প্রস্তাব এনেছে কংগ্রেস৷ বিরোধী দলনেতা জয়নাল আবেদিনের যাবতীয় অভিযোগ শোনার পর সবে বলতে উঠেছেন জ্যোতিবাবু৷ খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ করছেন হাফিজ৷ ‘‘জ্যোতিবাবু গ্যালারির দিকে দেখিয়ে স্পিকারকে বললেন, এদেরকে (গ্যালারিতে বসা স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে) কেন আনেন আপনি৷ ওই মিখ্যাবাদীর (জয়নাম আবেদিন উদ্দেশ্যে) কাছে এরা কী শিখবে? ততক্ষণে রেগেমেগে বিধানসভা থেকে ওয়াক-আউট করেছেন জয়নাল৷ জ্যোতিবাবু বললেন, দেখলেন চলে গেল৷ আমার তো অনেক জবাব দেওয়ার ছিল৷ এখন কী চেয়ারের সঙ্গে কথা বলব?’’

তবে ২০০১ সালের নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে বামফ্রন্টের বিজয় উৎসবে দলকে যেকথা বলেছিলেন, তা মনে থাকবে হাফিজের৷ ‘‘জ্যোতিবাবু বলেছিলেন, ১০ শতাংশ মানুষ ভোট দিতে পারেননি৷ ওরা ভোট দিলে কী হতো তাও বামফ্রন্টের বিবেচনার মধ্যে রাখা উচিত৷’’

হাফিজের মতে প্রবাদপ্রতীম ব্লক নেতা অশোক ঘোষের মতো অসীম মেধা সম্পন্ন মানুষ তিনি কমই দেখেছেন৷ ‘‘২০০৬ সালে সরকার গঠনের সময় শোনা যাচ্ছিল ফরওয়ার্ড ব্লক নাকি বেশি দপ্তর পাবে না৷ আলিমুদ্দিনে বৈঠকে অশোকদা আমাকেও নিয়ে গেলেন৷ বিমান বসু, জ্যোতিবাবু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও রয়েছেন৷ এটা সেটা কথা হচ্ছে৷ কিন্তু দপ্তর বণ্টনের বিষয়টি উঠছেই না৷ বুদ্ধবাবু বিমান বসুকে বললেন, তাহলে কথা বার্তা শুরু করা যাক৷ বিমানবাবুকে থামিয়ে অশোকদা বললেন, বিমান কেন? আমি আরম্ভ করব৷ ফরওয়ার্ড ব্লক যে কৃষি দপ্তর পাবে না, তা আমাকে আনন্দবাজার পড়ে জানতে হবে? বুদ্ধবাবু, বিমানবাবু বললেন, প্রেসকে এমন কিছু বলা হয়নি৷ যদিও তারপর আর ফরওয়ার্ড ব্লকের দপ্তর কমেনি৷ জ্যোতিবাবুও চেয়ার ছেড়ে উঠার সময় বলে গেলেন, আমি তো আগেই বলেছিলীম, ওই সব কিছু হবে না৷’’

গোয়ালপোখর আসনটি ধরে রাখতে পারেননি হাফিজ৷ পাশ থেকে এক কর্মী বললেন, কলকাতায় পার্টির কাজের চাপ সামলে তিনি কেন্দ্রে সময় দিতে পারেন নি৷ কিন্তু নিজে মুখে বলতে পারেন না সেকথা৷ যা বলেন তা হল, ‘‘সময় দিতে পারি নি৷ তাই হেরেছি৷’’ সহজ স্বীকারোক্তি৷ তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কাছে কিছু গঠনমূলক কাজ আশা করেছিলেন প্রাক্তন ত্রাণমন্ত্রী৷ ‘‘বামফ্রন্টের ভূমি সংস্কার এবং ত্রি-স্তর পঞ্চায়েত মানুষ মনে রাখবে৷ এতবড় ম্যানডেট নিয়ে এসেও মমতা মানুষকে কী দিয়ে যাবেন৷ মানুষ কেন তাঁকে মনে রাখবে? একটা মাইলফলক তো রেখে যাওয়া উচিত৷’’

আর আপনার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য? ‘‘ভীষণ আবেগপ্রবণ৷ সৎ-আদর্শবান৷ তবে জ্যোতিবাবুর মত নন৷’’ জানান হাফিজ৷