সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সেদিনও খুন করার চেষ্টা হয়েছিল বিদ্যাসাগরকে। সেবারও জীবিত অবস্থায় প্রায় রাজনীতির শিকার হয়েই গিয়েছিলেন বর্ণপরিচয়ের জনক। ইতিমধ্যেই কে ভেঙেছে তা নিয়ে রাজনীতির কাদা ছোঁড়াছুড়ি চলছে। নেতা নেত্রীরা একে অপরের দিকে আঙুল তুলে দায় এড়াতে বলছেন, পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে এই ঘটনা। সেদিনও পরিকল্পনা করেই বিদ্যাসাগরকে খুন করার চেষ্টা হয়েছিল। সফল হয়নি। শ্রীমন্ত নামে এক লেঠেলের সৌজন্যে।

তখন বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন নিয়ে তুমুল হইচই চলছে দেশ জুড়ে। তখনকার অনেক হিন্দু কট্টরপন্থীরা বিষয়টা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের সঙ্গ দিয়েছিল বহু পণ্ডিতও। বিদ্যাসাগর তো বিদ্যাসাগরই। একগুঁয়ে মানুষটিকে যতই চাপ দেওয়া হোক তিনি ভাঙতে রাজি নন। উলটে আরও বেশি করে তোড়জোড় করে লেগে পড়েছিলেন বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়নে। সেই সময়েরই ঘটনা।

শহর কলকাতা তখন এমনিতেই ফাঁকা। আবার বেশি রাত, তাই রাস্তা ফাঁকা ধুধু। সংস্কৃত কলেজে থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। কাছেই বাদুড়বাগানে তাঁর বাড়ি। পায়ে হেঁটেই ফিরছিলেন। তখন তিনি ঠনঠনিয়ার কালীমন্দিরের কাছে। আর কিছুটা হাঁটলেই বাড়ি। হঠাৎ একদল দুষ্কৃতি এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে। মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে ফেলে। বিপদ বুঝে গিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর কিন্তু তাঁর কিছু করার নেই। বিদ্যা বুদ্ধি কিছুই যেন তাঁর সঙ্গ দিচ্ছিল না তখন। বুঝতে পারছিলেন‚ এরা ভাড়া করা খুনি। হঠাৎ করেই হাঁক দিলেন ‘কইরে ছিরে‚ সঙ্গে আছিস তো ?’।

অ্যাকশন শুরু। ঠিক যেন কোনও সিনেমার দৃশ্য। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ঠিক পিছনে অন্ধকারের মধ্যে থেকে এসে দাঁড়াল এক পাহাড় প্রমাণ লৌহমানব। মাথায় লাল পাগড়ি , হাতে লাঠি। জাপানি নিনজার মতো বাঙালি লেঠেলের হাতে ঘুরল লাঠি। শোনা যায় শ্রীমন্ত লেঠেলের লাঠির ঘায়ে জনা চারেক ভাড়াটে খুনির ইহলীলা সাঙ্গ হয়েছিল। বাকিরা ভয়ে পেয়ে এই মরি কি সেই মরি করে পালিয়েছিল। বিদ্যাসাগর হেঁটে বেঁকে গেলেন বাড়ির পথে। লাঠি হাতে ‘বডিগার্ড’ শ্রীমন্ত লেঠেল চলল তাঁর পিছু পিছু।

অথচ এই শ্রীমন্তকে একেবারেই পছন্দ ছিল না বিদ্যাসাগরের। বাবা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে বীরসিংহ গ্রাম থেকে সে এসেছিল ঈশ্বরচন্দ্রকে রক্ষা করতে। তিনি রাজি ছিলেন না। তাই সঙ্গে না থাকলেও বিদ্যাসাগরের ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলেন শ্রীমন্ত। বাকিটা ইতিহাস। সেদিনের ঘটনার পর বিদ্যাসাগর শ্রীমন্তকে ডেকে বলছিলেন, “শ্রীমন্ত‚ তুই না থাকলে খুন হয়ে যেতাম রে” শ্রীমন্তের উত্তর ছিল , “বাবু‚ আমাকে ‘ছিমন্ত‘ বলে ডাকবেন না। ‘নজ্জা করে’। ‘ছিরি’ বলেই ডাকবেন বাবু। আমি থাকলে আপনাকে খুন করবে কে ?”

ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় জানতে পেরেছিলেন তাঁর পুত্র ঈশ্বরকে খুন করতে চায় কলকাতার কিছু ধনী হিন্দু। তাদের উস্কে দিয়েছে কিছু পণ্ডিত। বিদ্যাসাগরের অপরাধ , তিনি বিধবা বিবাহ আইন নিয়ে কাজ করছেন। ১৮৫৫-র ২৬ জুলাই মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শেষ পর্যন্ত সক্ষম হয়েছিলেন হিন্দু বিধবাবিবাহ আইন পাশ করাতে। গোঁড়াদের ধারনা ছিল, ‘Hindu Widow’s Remarriage Act’ হিন্দুসমাজকে রসাতলে পাঠাবে। ভেঙে পড়বে হিন্দুসমাজ। তাই এর মাথাকে সরিয়ে দাও।

বিধবা বিবাহ আইন উদ্যোক্তার মাথায় সেদিন গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়নি। এক লেঠেল ছিল তাঁর সঙ্গে। মঙ্গলবারও লেঠেলরা ছিল ,কিন্তু সবাই তাঁর বিপক্ষে। তাঁকে বাঁচানোর জন্য একজন শ্রীমন্তের অভাব বোধ করছিলেন হয়তো। কাউকে পাননি। অতঃপর শিক্ষাঙ্গনেই এমন পরিণতি হল বিদ্যাসাগর মশাইয়ের। সত্তরের দশকেও মহাশয়ের মাথা কাটা গিয়েছিল নকশাল আন্দোলনের কোপে পরে। ওই সময় অনেক নকশাল নেতাদের সেই মূর্তি ভাঙাকে সমর্থন করতে দেখা গিয়েছিল৷ যদিও পরবর্তীকালে অনেক নকশাল নেতা অনুভব করেছিলেন অমন সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না৷ বাঙালির সেন্টিমেন্ট নকশাল আন্দোলেন নামে ওই ভাবে মূর্তি ভাঙাকে সমর্থন করছিল না৷