সুমন ভট্টাচার্যঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প,ইয়ায়ের নেতানিয়াহু আর সম্বিত পাত্র| আপাতত এক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে| ভাবছেন নিশ্চয়ই এদের মধ্যে মিল কোথায়?

ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফেসবুক দুবছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে| আর ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সুযোগ্য পুত্র ইয়ায়ের নেতানিয়াহুকে ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম বার করে দিয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাংসদদের বাড়ির সামনে গিয়ে হাঙ্গামা বাধানোয় প্ররোচনা দেওয়ার জন্য|

ভারতে বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্রের সঙ্গে টুইটারের কি নিয়ে বিরোধ, তা এতদিনে সবাই জেনে গিয়েছেন|

দুনিয়া জুড়েই দক্ষিণপন্থী রাজনীতির সঙ্গে আসলেই সোশ্যাল মিডিয়ার একটা লড়াই চলছে| এবং আমেরিকা বা ইজরায়েলে ঘটনাক্রম টা আসলে একরকমই| প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন মানতে চাননি তিনি নির্বাচনে হেরে গিয়েছেন, তেমনই নেতানিয়াহুর পুত্রও বিশ্বাস করতে চান না তাঁর পিতাকে সরিয়ে অন্য কেউ ইজরায়েলে সরকার গঠন করবে, প্রধানমন্ত্রী হবেন| ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের ক্যাপিটল হিলে হামলা করতে উৎসাহিত করেছিলেন, আর ইয়ায়ের নেতানিয়াহু সরাসরি ডাক দিয়েছেন বিরোধী পার্লামেন্ট সদস্যদের বাড়ির সামনে গিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে|

রাজনীতির সামান্য ছাত্র হিসেবে আর একটা মিল দেখে আমি অবাক হয়ে যাই| ট্রাম্পের ঘোর বন্ধু ছিলেন নেতানিয়াহু| একে অপরকে রোল মডেল মনে করতেন, সাহায্য করতেন| আর ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুকে আবার আদর্শ মানেন ভারতের ভক্তকুল! তাই নেতানিয়াহুর নির্দেশে যখন ইজরায়েলের সেনাবাহিনী প্যালেস্তাইনে বোমাবর্ষণ করছিল,তখনও ভারতে ভক্তকুল আনন্দে উল্লাস করছিল| কি অসাধারণ সহাবস্থান|

এই মিল এবং দক্ষিণপন্থী রাজনীতির চরিত্রকে একটু আমরা বুঝতে পারলে ইজরায়েলে নেতানিয়াহু বিরোধী সরকারের গঠনের সম্ভাবনা কি গভীর ইঙ্গিতবহন করে আমরা বুঝতে পারব| প্রথমত এই সরকারে অতি দক্ষিণপন্থীরা, মানে যাঁরা বলে প্যালেস্তাইনের কোনো অস্তিত্বেরই দরকার নেই, তাঁরা যেমন আছেন, তেমনই আরব মুসলিমদের প্রতিনিধিরাও আছেন| অর্থাৎ একেবারে বিপরীত মেরুতে থাকা ইজরায়েলের রাজনৈতিক দলের সদস্যরা| আট দলের এই জোটে মধ্যপন্থীরা যেমন আছেন, তেমনই বামেরাও আছেন|

ইজরায়েলের এই নতুন রাজনৈতিক জোটের চরিত্র এবং সমীকরণকে বুঝতে গেলে আরো কয়েকটি জিনিস জানতে হবে| গত ২ বছরে ইজরায়েলে ৪ টি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি| এবারে বিরোধী আট দলের জোট দাবি করেছে ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে তাদের দিকে ৬২ জন রয়েছেন|

প্রশ্ন উঠতেই পারে ইজরায়েলের গত ১২ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু কে সরাতে বিরেধীরা এত এককাট্টা কেন? এত বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের নেতারা জোট বাঁধতে রাজি হলেন কেন? কারণ ইজরায়েলের অর্থনীতিতে টান এবং নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ| জেরুজালেমের আদালতে নেতানিয়াহু এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে| ইজরায়েলের বিরোধী দলগুলির আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আরেকবার প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসতে পারলে দুর্নীতির অভিযোগে নিজের শাস্তি এবং জেলবাস এড়াতে পার্লামেন্টে কোনো রক্ষাকবচ পাশ করিয়ে নেবেন| সেইজন্য লিকুদ পার্টির বিরোধীরা সব মতভেদ ভুলে একমঞ্চে এসেছেন| আমাদের মনে রাখতে হবে, এই বিরোধীদের মধ্যে এমন অন্তত চারজন আছেন যাঁরা আগে নেতানিয়াহুরই সরকারের মন্ত্রী ছিলেন,তাঁর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী ছিলেন|

নেতানিয়াহুর বিরোধীরা একজোট হয়েছেন, প্রথম ধাপে তাঁদের লোককে ইজরায়েলের রাষ্ট্রপতি করতে পেরেছেন, পার্লামেন্ট এর স্পিকার পদ থেকে লিকুদ পার্টির নেতাকে সরাতে নোটিস দিয়েছেন, এবং আস্থাভোটের জন্য তৈরি হচ্ছেন| আর অন্যদিকে নেতানিয়াহু মরিয়া চেষ্টা করছেন বিরোধীদের ঐক্য ভেঙে দেওয়ার| সব মিলিয়ে আগামী ১৪ জুন ইজরায়েলের পার্লামেন্টে আস্থা ভোটের আগে টানটান উত্তেজনা|

শুধু এই টুকুতে মিল পাচ্ছেন? তাহলে আরেকটু বলি| আচমকাই ১০ জুন জেরুজালেম শহরে চরমপন্থী ইহুদীদের একটা মিছিল ডেকে দেওয়া হয়েছে| যে মিছিলের অনুমতি নেতানিয়াহুর সরকার দিয়েও দিয়েছে| এই মিছিলের যাওয়ার কথা জেরুজালেম শহরের মুসলিম এলাকা দিয়ে| বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের এবং ইজরায়েলের প্রধান সংবাদপত্রগুলির অভিযোগ, আস্থাভোটের আগে নেতানিয়াহু ইহুদি আর মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা বাঁধাতে চাইছেন| তাতে যদি তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে যেতে পারেন, দুর্নীতির অভিযোগকে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলতে পারেন|

শুরুতেই বলেছিলাম না, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অতি দক্ষিণপন্থীরা এক চিত্রনাট্য অনুসরণ করে| শুধু ভাষাটা বদলে যায়|

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.