এরদোগানের এতটা বাড় বাড়ল কার মদতে?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: গণভোটের মাধ্যমে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজের হাতে আরও ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন৷ যদিও এই ‘গণভোট’ নিয়ে তুরস্কের বিরোধীরাই প্রশ্ন তুলছেন৷ তাঁদের অভিযোগ, গণভোটের নামে অন্তত ২৫ লক্ষ ভোট জাল করেছে এরদোগানের প্রশাসন৷ এমনিতেই নিতান্ত কম ব্যবধানে জয় পেয়েছেন এরদোগান৷ সরকারি হিসাবেই, তাঁর হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে তুরস্কের ৫১.৪ শতাংশ ভোটার৷ এর উপর যদি বিরোধীদের অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে আপন দেশে এরদোগান আরও ক্ষমতাধর হয়ে উঠলেও বহির্বিশ্বে তাঁর মুখ পুড়বে৷

নিজের জামাই সহ গোটা পরিবারকে অসদুপায়ে মুনাফার সুযোগ দিতে এরদোগান যে গোপনে আইএসআইএসকে লাগাতার মদত জুগিয়েছেন, এমন দাবি আগেই আমেরিকা সহ পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে৷ এই অবস্থায় তুরস্কের পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁর গণভোটের ওজর ন্যাটো জোটেই কতখানি পাত্তা পাবে, সেটা একটা মস্তবড় প্রশ্ন৷

আসলে, অভ্যন্তরীণভাবে এরদোগান বেশ বেকায়দায় রয়েছেন৷ এর আগে তিনি নিজে যাঁদের বাছাই করে প্রধানমন্ত্রিত্বে বসিয়েছেন তাঁদের মধ্যেও একাধিক জন শেষ পর্যন্ত আর তাঁর একনায়কসুলভ আচার-আচরণ মেনে নিতে পারেননি৷ এবার তিনি তাই সে ব্যাপারেও একেবারে শেষ কথা বলার জন্য গণভোটের ভেক ধরেছিলেন৷ এই ‘গণভোটে’র রায় অনুযায়ী, তিনি এবার থেকে তুরস্কে যাঁকে খুশি তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাতে পারবেন এবং তার পর পছন্দ না হলে পার্লামেন্টের তোয়াক্কা না করেই তাঁর গর্দানও নিতে পারবেন৷

দুরাচারী অটোমান শাসকদের উৎখাত করে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক যখন তুরস্কের ক্ষমতায় এসেছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, গণতন্ত্রই ভবিষ্যৎ৷ কিন্তু পরবর্তীকালে অনেক সময়েই তাঁর সে কথা তুরস্কের শাসকরা গ্রাহ্য করেননি৷ এরদোগান আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছেন৷ যেভাবে তিনি ‘গণভোট’ করে তুরস্কে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়েছেন, সে রকমটা আগে কখনও ঘটেনি৷ এরদোগানের যাঁরা পৃষ্ঠপোষক, সেই পশ্চিমী দুনিয়ার কর্তাব্যক্তিরা এখনও সরাসরি এ ব্যাপারে কোনও কথা বলেননি৷ কিন্তু অন্য কোনও দেশে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারকে পদদলিত হতে দেখলে যাঁরা রাতে ঘুমতে পারেন না, তাঁরা এরদোগানের এই অটোমান সম্রাটসুলভ আচরণকে কী চোখে দেখবেন— সেটা লক্ষ রাখা দরকার৷

দীর্ঘকাল ধরে দাপটে রাজত্ব করার পর অটোমান সাম্রাজ্য যখন পচেগলে ধ্বংস হওয়ার দাখিল তখন তুর্কি সম্রাটরা পশ্চিমী দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানকার শিক্ষা-সভ্যতা আয়ত্ত করার চেষ্টা করেছিলেন৷ সামরিকভাবে আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার সমকক্ষ হয়ে ওঠাই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্য৷ কিন্তু আধুনিক সভ্যতা কেবল সামরিক দিক থেকেই তুরস্কে প্রবেশ করেনি, একইসঙ্গে আধুনিক গণতন্ত্র ও উদারনৈতিক চিন্তাধারাও সেখানে প্রবেশ করেছিল৷ যে ব্রিটিশ এবং ফরাসি সামরিক অফিসাররা সেই সময় তুরস্কের সেনাবাহিনীকে তালিম দিতে ইস্তানবুলে গিয়েছিলেন, তাঁরা শুধু আধুনিক রাইফেল চালাতে শেখাননি৷ আধুনিক বিশ্বের চিন্তাভাবনাতেও তাঁরা সেখানকার কমবয়সী সেনা অফিসারদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন৷ আর সেই চিন্তাধারাই জন্ম দিয়েছিল কামাল আতাতুর্কের মতো বিদ্রোহীদের৷ কামাল আতাতুর্ক ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা বুঝেছিলেন, পাশ্চাত্য শিক্ষার পথে তুরস্ককে পরিচালনা না করলে অবস্থা সঙিন৷ এর জন্য অনেক তিক্ত এবং কঠোর সিদ্ধান্তও তাঁদের নিতে হয়েছিল৷ কিন্তু শত শত বছরের অটোমান শাসনের গ্লানি তাতে ঘুচেছিল৷ তুরস্ক পা বাড়িয়েছিল আধুনিকতার পথে৷

কিন্তু এরদোগান যা করছেন তাতে মনে হচ্ছে— তিনি সেই গৌরবময় ইতিহাসের ঘাড় ধরে তাকে ডাস্টবিনে পাঠানোর চেষ্টা করছেন৷ আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন অটোমান শাসকদের খলিফাতন্ত্র৷ তার জন্য তিনি আধুনিকতার কিছু মোড়ক লাগিয়েছেন৷ সেই কারণেই গণভোট৷ অটোমান শাসকরা তাঁদের খোজা আমলাতন্ত্র এবং জ্যানিসারি বাহিনী দিয়েই সব কিছুর মোকাবিলা করতেন৷ কিন্তু এরদোগানের পক্ষে তো আর সেটা সম্ভব নয়৷ ঘড়ির কাঁটা অতখানি পিছিয়ে দেওয়া তাঁর পক্ষেও সম্ভব নয়৷ কারণ তিনিও বিলক্ষণ জানেন, সেটা করতে গেলে তাঁর অবস্থা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তুরস্কের যা হাল হয়েছিল তার চাইতেও খারাপ হবে৷ পশ্চিমী দুনিয়া তাঁকে আশকারা দিচ্ছে একটাই কারণে৷ ঠিক যে কারণে ব্রিটিশরাজ ক্রিমিয়ার যুদ্ধে অটোমান তুর্কিদের পাশে দাঁড়িয়ে রাশিয়ার জারের বিরুদ্ধে লড়েছিল৷ তুরস্কের অবস্থান তাদের কাছে এখনও স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷ তুরস্কের ঠিক মাথার উপরেই রাশিয়া তথা তার ককেশাস অঞ্চল৷ ভূরাজনৈতিক দিক থেকে তাই তুরস্ক রাশিয়ার কাউন্টারওয়েট৷ অন্তত পশ্চিমী দুনিয়ার চোখে এখনও তা-ই৷

আর শুধু এ কারণেই তুরস্কের শাসককুল এখনও বিলেত-আমেরিকার কাছে এত কদর পান৷ কিন্তু সত্যিই যদি সেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে, তাহলে কি ওয়াশিংটন সহ ন্যাটো জোট আর চুপ করে বসে থাকতে পারবে? এখন তো আর ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগ নয়৷ ওয়ারশ জোটই আর নেই৷ তাহলে আর কার বিরুদ্ধে কার হয়ে লড়াই? এরদোগান খুব বড় বাজি লড়েছেন৷ শেষ পর্যন্ত সেই বাজি তিনি জেতেন, না হারেন—একমাত্র হোয়াইট হাউসই সেটা বলতে পারবে৷