নারী দিবস বিশেষ: রাঙামাথায় চিরুনি

মেয়েদের অধিকার নিয়ে আজকাল অনেকেই সরব৷ মেয়েরাও বেশ সচেতন হয়ে উঠেছেন বলে আমারও মনে হয়৷ গাঁ গঞ্জ থেকে কসমোপলিটান শহর পর্যন্ত সর্বত্র নারীমুক্তির প্রচার ও প্রচেষ্টা দুটোই জারি আছে। এর পাশাপাশিই পাল্লা দিয়ে আছে বিবাহকে কেন্দ্র করে মেয়েদের জন্য নানান উপহার, গয়না শাড়ি নিরাপত্তার প্রচার। ‘বিবাহ’কে পটভূমি করে ভারতীয় তথা বাঙালি পুরুষের জন্য খুব জোর পাঞ্জাবি বা কুর্তার বিজ্ঞাপন দেখা যেতে পারে। কিন্তু মেয়েদের মধ্যে বিয়ের জমকালো স্বপ্নের হাতছানি এত প্রবল এক উৎকট যে মনে হয় শুচিবাই-ই মেয়েদের জীবনের চরম মোক্ষ!

শতরূপা সান্যাল (চিত্র পরিচালক)

আমাদের শিশু বেলায় নানান ছড়া শুনতাম। যেমন– “দোল দোল দুলুনি/ রাঙা মাথায় চিরুনি”। এরকম আরও বহু ছড়াই ওই সুরটাইয় ধরা আছে। মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে। সেগেগুজে রাণীর মতোন। তারপর সেখানে যে কী করবে?– সেটাও কোনও কোনও ছড়ায় বলে দেওয়া ছিল। যুগ যুগ ধরে মেয়েদের স্বাধিকারের পা টেনে ধরা শেকলগুলির অন্যতম একটি শেকল হল তাকে বিবাহমুখী করে তোলার প্রয়াস। বাবা মা আত্মীয় স্বজন তো আছেই। সেই সঙ্গে আছে হরেক বিজ্ঞাপন, এখন তাঁর সঙ্গে সুপ্রযুক্ত হয়েছে টেলিভিশনের সিরিরয়াল।

রেনেসাঁর পর মেয়েরা যতটা এগিয়ে গিয়েছিল, এখন যেন তাঁর পশ্চাদগম শুরু হয়েছে। অন্তত বাংলা টেলিভিশনের সিরিয়ালগুলি তো সেটাই প্রচার করছে। ‘বিয়ে’ হল একটা প্রস্তুত মায়াবী লটারি– যেটায় সবাইকে অংশ নিতে হবে। কখনও কখনও অজস্রবার। সেই খেলার ঝোঁকে হারাবার জন্য শাশুরি, ননদী, বরের প্রেমিকা, দাদু-দিদা ইত্যাদি সবাই হাত ছুঁয়ে পড়ে যাবে। আর মেয়েটিও মরতে মরতে অপমানিত হতে হতে ‘লক্ষী রোটি’ হবার পরীক্ষা দিতে থাকবে।

- Advertisement -

এই সব দেখতে দেখতে আমার মাধবীর কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে। কুচকুচে কালো এবং ভারী মিষ্টি মুখশ্রীর মাধবী ছিল আমার চেয়ে তিন ক্লাসের ছোট। স্কুলের কথা বলছি আমি। মাধবী অসাধারণ গান গাইত। কিন্তু ছিল ভারী দুরন্ত। বাবা ধনী। কাজেই তাঁর স্বপ্ন ছিল কন্যার দুর্দান্ত একটা বইয়ে দেবেন। মাধবী তাঁর স্বপ্ন চুরমার করে দিয়ে এক দর্জির ছেলেকে ভালোবাসল। বাবাকে বলল– একে আমি বিয়ে করব বাবা। মাধবী তখন মাধ্যমিক দিয়েছে সদ্য। বাবা অগ্নিশর্মা হয়ে বললেন– দূর হয়ে যা।

মাধবীর বিয়ের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা, প্রচুর গয়না জমিয়ে রেখেছিলেন বাবা। মাধবীকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। কিন্তু যতই আদরের হোক মেয়ে নিজের পছন্দে নিজের জীবন সাজাবে, এ আবার হয় নাকি?

মাধবী একদিন বাবার কাছে এসে বলল– আমাদের বাড়ির একতলার ঘরগুলো তো খালিই থাকে– আমায় থাতে দেবে বাবা? তোমার কাছ থেকে টাকা নেব না। গান শেখাব এখানে। আর থাকব। বাবা বললেন– না। তা হবে না। আমার অমতে তুমি বইয়ে করেছো আমার মতে তুমি মৃত!
মাধবী পুজোর দিন হঠাৎ কাপড়ে আগুন লেগে মারা যায়। পেটের বাচ্চাটারও ওর সাথেই জন্মানোর সম্ভাবনাটা শেষ হয়ে যায়। শুনেছিলাম ওর বাবা তারপর বেশিদিন বাঁচেনি।

সেই ট্রাডিশন এখনও চলছে। যতই মেয়েকে লেখা পড়া শেখাও, অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন করার চেষ্টা করো– সেই অদ্ভুত এক মায়াবী আবর্তের টানে আজও মেয়েরা ছুটে যায় চরম মোক্ষ মনে করে বাবা মার ইচ্ছে স্বপ্ন। ওই একটি ঘটনাকে ঘিরে। মেয়েটিরও তাই। কাজেই, ভুল ভ্রান্তি হলেও তার জের টেনে নিয়ে যেতে হয়, নিজেকে নত করতে ইচ্ছের ব্বিরুদ্ধে বা স্বেচ্ছাতেই সব নিজস্বতাকে জলাঞ্জলি দিতে দিতে কখন যে একটা স্বাধীন মানুষ ‘দাস’এ পরিণত হয়, তা যে নিজেও জানে না।

All rights reserved by @ Kolkata24x7 II প্রতিবেদনের কোন অংশ অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ