স্বরলিপি দাশগুপ্ত, কলকাতা: মাত্র ২৫ জনকে নিয়ে পার্ক সার্কাস ময়দানে শুরু হয়েছিল এনআরসি, সিএএ বিরোধী আন্দোলন। দিনে দিনে সেই সংখ্যাটা বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। রবিবার সন্ধেয় পার্ক সার্কাসে তাই যত রাত হয়েছে, ততই জোরদার হয়েছে আজাদির স্লোগান। মাথা উঁচু করলেই অগুন্তি তিরঙ্গা উড়তে দেখা যাচ্ছে।

কয়েক মাস আগেও যে মহিলারা দিনের আলো পড়ে যেতেই ঘর থেকে বেরনোর কথা ভাবতেনও না তাঁরাই আজ ঘড়ির কাঁটা বা শীতের রাতকে তোয়াক্কা না করে ঠায় বসে রয়েছেন। বাঁশ দিয়ে ঘেরা সেই এলাকায় ঠিক কতজন মহিলা বসে রয়েছেন তা গুনতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। তবে প্রতিবাদ স্থলে বসার আগে ঘরের সমস্ত কাজ সেরে আসছেন সকলে। বাড়িতে রান্না করে স্বামীকে অফিস পাঠিয়ে বা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে সোজা চলে আসছেন পার্ক সার্কাসের এই প্রতিবাদ ময়দানে। যেন এটাই তাঁদের দ্বিতীয় কর্মস্থল।

কেউ কেউ আবার কোলের একরত্তি খুদের সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মা, শাশুড়ি মা-কেও। এঁদের সবাই যে এলাকার বাসিন্দা তা কিন্তু নয়। অনেকেই রোজ ঘণ্টাখানেক যাত্রা করে হকের লড়াই করতে রোজ এখানে হাজিরা দিচ্ছেন। যেমন মেটিয়া বুরুজ থেকে রবিবার এসেছিলেন বছর ৫০-এর রোশন মানাভর। পরনে কালো বোরখা। রোশন মানাভর জানান, “সিএএ আর এনআরসি হতে দেওয়া যাবে না। হলে আমরা বিপদে পড়ব। এটা আমাদের অধিকার। আমরা লড়াই করে যাব।” এই প্রতিবাদ শুরুর আগে রক্ষণশীল পরিবারের প্রৌঢ়া ভাবতেও পারতেন না এত রাতে রাস্তায় বসতে হবে। কিন্তু অধিকারের লড়াইতে স্বামীরও সমর্থন রয়েছে। তা বেশ জোর গলাতেই বললেন তিনি। কথা বলতে বলতেই চোখের কোণে জল জমে গেল রোশনের।

বললেন, “আমি তো গৃহবধূ। কোনওদিনই এভাবে বেরোতে হবে ভাবিনি। মোদী বেটি বঁচাও, বেটি পড়াও-এর কথা বলেন। কিন্তু দেশের মহিলাদের, অর্থাৎ আমাদের মোদী রাস্তায় বসিয়ে দিয়েছেন। আমরা এই দেশের মাটিতে জন্মেছি। আমাদের দফনও করা হবে এই মাটিতেই।” রোশনের সঙ্গে এসেছিলেন তরুণী মুনিরা রুকসানাও। সকাল ৯টায় বাড়ি থেকে বেরোন অফিসের জন্য। আর অফিস শেষ হতেই চলে আসেন পার্ক সার্কাস ময়দানে। আবার রাত হলে বাড়ি ফেরেন।

 

মুনিরাও বলছেন, “আমরা রোজ আসব। যতদিন আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পাচ্ছি না, আসব। এই ভাবে আমাদের থেকে মোদী অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবেন না। আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করছি, করব।” মুনিরাও শেষে আবেগঘন গলায় অনুরোধ করলেন, “আপনারাই সত্যিটা দেখাতে পারবেন। আমরা হকের লড়াই করছি। দয়া করে আমাদের পাশে থাকবেন। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমই ঠিকটা দেখাচ্ছে না। দয়া করে সত্যিটা দেখাবেন।” ভিড়ের মাঝে বসেছিলেন ৭০ বছরের সমিদা খাতুন। শীতের রাতে বসে থাকলেও, সহাস্য মুখ নিয়ে প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন তিনি। বয়স জিজ্ঞাসা করতেই প্রথমে রসিকতা করেই বললেন “আমার বয়স ২২।” আশপাশে বসা মহিলারা বৃদ্ধার রসিকতা শুনে হেসে উঠলেন।

বৃদ্ধা বললেন, “শরীরে কষ্ট হয়। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি এই প্রতিবাদ। তাই এখানে এসে বসছি। মোদী যেমন তাঁর কাজ করছেন। আমরাও আমাদের প্রতিবাদ চালিয়ে যাব।” বাড়িতে থেকে কোনও কাজ করতে হয় না সমিদা খাতুনকে। বৃদ্ধার কথায়, “বাড়িতে বউমার সঙ্গে গল্প করেই কেটে যায়। কিন্তু এখন তো এখানে আসতে হবে।” বৃদ্ধার সঙ্গে এসেছেন তাঁর দুই মেয়ে ও নাতনি।

বড় মেয়ে ফিরোজা পরভিনের কথায়, “এখানে আমরা আন্দোলন করছি শান্তিপূর্ণ ভাবে। বাচ্চারাও এসেছে। আমরা এই আন্দোলন চালিয়ে যাব।” আর এই সমস্ত কথাবার্তার সময়েই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতোই চলছিল আজাদি স্লোগান, “ইয়ে হক হ্যায় হমারি, আজাদি। হম লড়কে লেঙ্গে আজাদি।”

প্রশ্ন অনেক: দশম পর্ব

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবিই শুধু নন, ছিলেন সমাজ সংস্কারকও