শংকর দাস, বালুরঘাট: গোটা দেশ তোলপাড় শবরীমালা নিয়ে৷ মহিলাদের অধিকার নিয়ে৷ মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিয়ে৷ কিন্তু প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতোই সেই একই রকম নিয়ম একই ভাবে বলবৎ এ রাজ্যের এই মন্দিরেও৷ যদিও পাদপ্রদীপের আলো থেকে আর তোলপাড় করা খবর থেকে তা অনেকটাই দূরে৷

তবু বছরের পর বছর ধরে মহিলাদের প্রবেশ নিষেধ দক্ষিণ দিনাজপুরের ভিকাহার মন্দিরবাসিনী কালীর মন্দিরে। শবরীমালার থেকে এখানকার তফাৎ এটাই যে বছরের আর দশটা দিন বিধিনিষেধ না থাকলেও, দীপান্বিতার অমাবস্যার পুজোর রাতে মহিলাদের প্রবেশ চরম ভাবে নিষিদ্ধ। পুজোর যোগাড় ও আয়োজন সমস্ত কিছুই করেন পুরুষরা। শুধু তাই নয়, নিজে অন্ধকার বিনাশকারিনী হয়েও মা কালী এখানে অসূর্যস্পর্শা।

দিনের আলো নিভে যাওয়ার পরই প্রতিমার চক্ষুদান ও রাতের মধ্যেই পূজাপাঠ ও যাবতীয় আচার সম্পন্ন করতে হয়। এমনকি ভোগ রান্না ও পুজো শেষে প্রসাদ বিতরণ ও সূর্যোদয়ের আগেই প্রতিমার বিসর্জন হয়ে থাকে। প্রাচীন কাল থেকেই এই নিয়মই বহাল রয়েছে ভগ্নপ্রায় মন্দিরটিতে৷ সেই নিয়মেরই যেন পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মন্দির সংলগ্ন প্রাচীন বট ও পাকুড় গাছ৷

সভ্য সমাজ মন্দিরটির প্রাচীনত্ব ও গরিমা ধরে রাখতে না চাইলেও গাছ দু’টি কিন্তু তাদের শেকড়ে সেটিকে আগলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

কথিত রয়েছে তিনশো বছরেরও আগে অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুরের মহারাজ প্রাণনাথ প্রথম এই পুজোর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন সু-উচ্চ মন্দির। যার গায়ে দিনাজপুরের নিজস্ব শিল্পকলা টেরাকোটার অপূর্ব সব কারুকার্য খোদিত রয়েছে। কথিত আছে সেই সময় জনৈক সাধক স্বপ্নাদেশ পেয়ে তাঁর মেয়ে মন্দিরাকে জীবন্ত সমাধিস্থ করেছিলেন এখানে। যে কারণে এখানে মা কালীর নাম হয়েছে মন্দিরবাসিনী।

মা কালী নিজেই একজন বামা হলেও মন্দিরবাসিনীর মন্দিরে মহিলারা প্রবেশ করতে পারেন না। পুজোর রাতে মন্দিরে প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞার কারণ সম্পর্কে কারোই কিছু জানা নেই। মন্দিরের পুরোহিত নারায়ণ চন্দ্র ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে তিনশো বছর আগে থেকেই এই নিয়ম বহাল রয়েছে।

যা আজও নিষ্ঠার সাথে মেনে আসছেন এলাকার মানুষজন এমনকি মহিলারাও। পুজোর রাতে প্রদীপ মোমবাতি অথবা মশাল ছাড়া অন্য কোনও আলো এখানে জ্বালানো হয় না। রাতের মধ্যে বিসর্জন সহ পুজোর সমস্ত কিছু সম্পন্ন করা হয়।

ইতিহাস গবেষক সমিত ঘোষ জানিয়েছেন যে প্রাচীন এই মন্দিরটির গায়ে খোদাই করা রয়েছে টেরাকোটার অপূর্ব সব নকশা। যার সাথে হুবহু মিল রয়েছে কান্তজী মন্দিরের। মন্দিরবাসিনী মন্দিরের মূল ফটকের উপর দুই পাশে রয়েছে কষ্টিপাথরের তৈরী দুইটি হাতির দাঁত। রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে সেগুলির বেশির ভাগই আজ হারিয়ে গেছে। সম্প্রতি রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের তালিকায় মন্দিরবাসিনী মন্দিরটি স্থান পেয়েছে।