বিশ্বজিৎ ঘোষ, কলকাতা: মহিলাদের শারীরিক গঠন বদলে চলেছে নাশপাতি থেকে আপেলের মতো আকৃতিতে৷ কেননা, ক্রমে আরও বিস্তৃত হচ্ছে ওই মহিলাদের কোমরের আকৃতি৷ আর, তার সঙ্গে রয়েছে মোটা পেট অর্থাৎ, তাঁদের পেটে ক্রমে আরও মেদ জমে যাওয়ার বিষয়টিও৷ এবং, তার জেরেই, প্রাণসংশয়ে রয়েছেন ওই সব মহিলা৷

পিছিয়ে নেই কলকাতাও৷ এই শহরের মহিলাদের মধ্যেও বাড়ছে তাঁদের শারীরিক গঠনের আকৃতি নাশপাতি থেকে আপেলের মতো বদলে যাওয়ার ঘটনা৷ আর, তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তাঁদের বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাস, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য এবং দেরি করে রাতের আহার গ্রহণের বিষয়টিও৷ এবং, এমন নানা কারণেই, এ দেশের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি কলকাতার ওই সব মহিলাও রয়েছেন প্রাণসংশয়ে৷ এমনই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায়৷ ওই তথ্যের জেরে একই সঙ্গে যারপরনায় উদ্বিগ্ন এবং আতঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা৷ কেন?

কারণ, যেভাবে এ দেশের ওই সব মহিলা রয়েছেন প্রাণসংশয়ে, তাতে পরিস্থিতির বদল না ঘটলে, বিষয়টি মহামারির আকারে পৌঁছে যাবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ অথচ, এমন প্রাণসংশয়ের কবল থেকে মুক্ত থাকাও অসম্ভব নয়৷ এবং, মুক্ত থাকার বিষয়টি যে সহজ নয়, তাও নয়৷ কিন্তু, খামতি থেকে যাচ্ছে যথাযথ সচেতনতায়৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ ওই সব মহিলার মধ্যে যাঁরা সচেতন, তাঁদের ক্ষেত্রেও দেখা দিচ্ছে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবহেলার বিষয়টি৷ বদলে চলা দুনিয়ায় কর্মব্যস্ত জীবনের জেরে দেখা দিচ্ছে সময়ের অভাবও৷ যে কারণেও, সচেতন হওয়া সত্ত্বেও, কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবহেলার বিষয়টি দেখা যাচ্ছে ওই সব মহিলার মধ্যেও৷ এমনই নানা কারণে ওই সব মহিলা এড়াতে পারছেন না খোদ তাঁদের-ই প্রাণ সংশয়ের বিষয়টি৷

অন্যদিকে, যথাযথ সচেতনতার অভাব এবং সচেতন হওয়া সত্ত্বেও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবহেলার কারণে, অন্য মহিলাদের মধ্যেও বেড়ে চলেছে তাঁদের শারীরিক গঠনের আকৃতি নাশপাতি থেকে আপেলের মতো বদলে যাওয়ার ঘটনা৷ আর, তার সঙ্গে আবার পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে ওই সব মহিলার প্রাণসংশয়ের বিষয়টিও৷ ওই সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মহিলাদের শারীরিক গঠন নাশপাতি থেকে আপেলের মতো আকৃতিতে বদলে যাওয়ার জেরে তাঁদের প্রাণসংশয়ের বিষয়টি কলকাতা তথা পূর্বাঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি এ দেশের পশ্চিম, দক্ষিণ এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে৷ তবে, এমন তথ্যের জেরে কলকাতার মহিলাদের মধ্যে স্বস্তি বৃদ্ধিরও তেমন কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা৷ কেননা, যেভাবে ধীরে ধীরে কলকাতার মহিলাদের মধ্যেও বেড়ে চলেছে নাশপাতি থেকে আপেলের মতো আকৃতিতে শারীরিক গঠন বদলে চলার ঘটনা, তাতে অবিলম্বে যথাযথ সচেতন না হলে, আগামী দিনে তাঁদের মধ্যেও প্রাণসংশয়ের বিষয়টি দেখা দেবে বলে আশঙ্কায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷

আশঙ্কার যথেষ্ট কারণও রয়েছে৷ কেননা, সাম্প্রতিক ওই সমীক্ষায় প্রকাশ, শারীরিক গঠন নাশপাতি থেকে আপেলের মতো আকৃতিতে বদলে গিয়েছে কলকাতার যে সব মহিলার, তাঁদের ৯০ শতাংশ রয়েছেন প্রাণসংশয়ে৷ কেন? ওই সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার ওই সব মহিলার শারীরিক গঠন অর্থাৎ, তাঁদের উচ্চতার সঙ্গে ওজনের ভারসাম্যের বিষয়টি রয়েছে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি৷ শুধুমাত্র তাই নয়৷ কলকাতায়-ই এমন ৮৮ শতাংশ মহিলা রয়েছেন, যাঁরাও রয়েছেন প্রাণসংশয়ে৷ কারণ, ওই সব মহিলা দেরি করে রাতের আহার গ্রহণ করেন৷ অন্যদিকে, এ দেশের বিভিন্ন শহরের ৬০ শতাংশেরও বেশি মহিলা রয়েছেন প্রাণসংশয়ে৷ স্বাভাবিক কারণেই, এমন তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা একই সঙ্গে যারপরনায় উদ্বিগ্ন এবং আতঙ্কিত৷ এ দেশের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি কলকাতার ওই সব মহিলাও কেন রয়েছেন তাঁদের প্রাণসংশয়ে? কারণ, শারীরিক গঠন নাশপাতি থেকে আপেলের মতো আকৃতিতে বদলে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে তাঁদের হৃদযন্ত্রের উপরে৷

যে কারণে, ওই সব মহিলা রয়েছেন কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজেস (CVDs)-এর ঝুঁকিতে৷ এবং, CVDs-এর প্রভাবে শুধুমাত্র যে ওই সব মহিলা হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, তাই-ই নয়৷ একই সঙ্গে তাঁরা থেকে যাচ্ছেন স্ট্রোক (ব্রেন অ্যাটাক)-এর ঝুঁকিতেও৷ ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে কোন অবস্থায় রয়েছে তাঁদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়টি, তার-ই উপরে সম্প্রতি এক সমীক্ষা চালানো হয়েছে মেট্রো এবং নন-মেট্রো মিলিয়ে এ দেশের মোট ১০টি শহরে৷ সাফোলালাইফ স্টাডি ২০১৫ শীর্ষক ওই সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, CVDs তথা হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন এ দেশের শহরাঞ্চলের ৬০ শতাংশেরও বেশি মহিলা৷ ওই সব মহিলার বয়স ৩০ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে৷ অন্যদিকে, উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় থাকা অর্থাৎ, স্বাভাবিকের তুলনার অতিরিক্ত ওজনের কারণে কলকাতার ৯৩ শতাংশ মহিলা রয়েছেন CVDs-এর ঝুঁকিতে৷ মহিলাদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে প্রাপ্ত এই ধরনের তথ্য যথেষ্ট আশঙ্কার বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা৷

মেডিকা সুপারস্পেশালিটি হসপিটালের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং কলকাতার বেসরকারি ওই হাসপাতালের-ই সিনিয়র কনসালটেন্ট কার্ডিয়াক সার্জন, চিকিৎসক কুণাল সরকারের কথায়, ‘‘উচ্চ মাত্রায় লো-ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (LDL) এবং উচ্চতার সঙ্গে ওজনের অনুপাত অর্থাৎ, বডি মাস ইনডেক্স (BMI) স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি মাত্রায় থাকার কারণে, মহিলাদের মধ্যে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজেসের হার ধীরে ধীরে মহামারির পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্য এবং তার সঙ্গে দেরি করে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য, ওই সব মহিলার পেটে আরও বেড়ে যাচ্ছে চর্বি৷ যে কারণে, ওই সব মহিলার কোমর এবং তাঁদের নিতম্বের আকৃতির অনুপাতে বজায় থাকছে না ভারসাম্য৷ এই বিষয়টিও ওই সব মহিলার ক্ষেত্রে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে৷’’ কেন?

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কুণাল সরকার বলেন, ‘‘হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নাশপাতির মতো আকৃতির শারীরিক গঠনের বিষয়টিও৷ অথচ, পেটে চর্বি জমে যাওয়া এবং কোমরের স্থূলতা বেড়ে যাওয়ার কারণে, মহিলাদের শারীরিক গঠন বদলে যাচ্ছে নাশপাতি থেকে আপেলের মতো আকৃতিতে৷ এ ভাবে শরীরের আকৃতি বদলে যাওয়া মহিলাদের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে৷ আর, এই বিষয়টিও ওই সব মহিলাকে পৌঁছে দিচ্ছে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার দিকে৷’’ এখানেও শেষ নয়৷ আরও রয়েছে মহিলাদের প্রাণসংশয়ের কারণ৷ চিকিৎসক কুণাল সরকারের কথায়, ‘‘শারীরিক গঠন বদলে যাওয়ার সঙ্গে রয়েছে ধূমপান এবং বিভিন্ন ধরনের কাজ কর্মে কায়িক শ্রম কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও৷ যে সব মহিলা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় আক্রান্ত, তাঁদের ক্ষেত্রেও বেড়ে চলেছে CVDs-এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি৷’’

কলকাতার ফর্টিস হসপিটালের ডায়াটেশিয়ান ঈপ্সিতা চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘বেশি মাত্রায় চর্বি রয়েছে এমন খাদ্য গ্রহণ, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এমন মানসিক চাপ, ধূমপান এবং বিভিন্ন ধরনের কাজ কর্মে কায়িক শ্রম কমিয়ে দেওয়ার বিষয়টি, মহিলাদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অন্যতম বাধার কারণ হিসেবে রয়েছে৷ যে কারণে, যে সব মহিলা এড়াতে পারছেন না ওই সব বিষয়, তাঁদের হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ক্রমে আরও অবনতির পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে৷’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘সময়ের অভাব এবং কর্মব্যস্ত জীবনের জন্য শহরাঞ্চলের মহিলাদের মধ্যে অনেক দেরি করে রাতের খাবার খাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে৷ এই ধরনের প্রবণতার ফল, হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যাকে আমন্ত্রণ জানানো ছাড়া অন্য কিছু নয়৷’’