সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ভারত ছাড়ো আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল ইন্দিরা ও ফিরোজ গান্ধিকে৷ ১৯৪২ সালের ২৬ মার্চ বিয়ে হয়েছিল তাদের৷ ইন্দিরার সঙ্গে ফিরোজের বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই গান্ধিজি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন৷ বাপুজি ডাক দিলে সে ডাকে সাড়া না দিয়ে তো উপায় নেই ৷ তার উপর এই নবদম্পতির বিয়েতে তো একটা ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে বাপুর৷ স্বাভাবিক ভাবেই সদ্য বিবাহিত এই নবদম্পতি জড়িয়ে পড়ল ফের আন্দোলনে৷ আন্দোলন শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা পড়তেই হল তাদের ৷

বম্বেতে ১৯৪২ সালের ৭ এবং ৮ অগাস্ট অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির মিটিং। বৈঠকের দ্বিতীয় দিনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল- ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু হবে। ব্রিটিশ চাইছে বার্লিন-রোম-টোকিও এই অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারতীয়রা অংশ নিক। কিন্তু প্রশ্ন তোলা হল- যে দেশ নিজেই স্বাধীন নয় সে দেশ কেমন করে লড়বে কোনও এক পক্ষের হয়ে। বরং উল্টে ডাক দেওয়া হল-‌ ব্রিটিশ তুমি ভারত ছাড়ো।তার অবশ্য কয়েকদিন আগেই বম্বে পৌঁছে গিয়েছেন ফিরোজ আর ইন্দিরা । ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ব্যাপারে ‌৮ অগাস্ট কংগ্রেস সিদ্ধান্ত নিতেই রাতারাতি শুরু হয়ে গেল ধরপাকড়। ৮ অগস্টের রাত থেকেই এবং ৯অগস্ট কংগ্রেসের বেশিরভাগ নেতাকেই গ্রেফতার করতে লেগে গিয়েছিল পুলিশ।

সেদিন জওহরলালের সঙ্গে ফিরোজ ইন্দিরাও রয়েছে বম্বেতে আত্মীয় রাজা হাতি সিংয়ের ফ্ল্যাটে৷ সেখানেই নৈশ ভোজ সেরেছেন ওরা। ৯ অগাস্ট ভোর পাঁচটা পনেরো নাগাদ ইন্দু তার বাবাকে ঘুম থেকে তুলে জানিয়ে দিল পুলিশ এসেছে। পুলিশের কাছে রয়েছে জওহরলাল এবং তার ভগ্নিপতি রাজা হাতি সিংহের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তখন শহরটা সবে জাগছে। তাদের নিয়ে পুলিশ চলল ভিক্টোরিয়া টার্মিনাসের দিকে। অন্য একটা গাড়িতে ফিরোজ, ইন্দিরা এবং কৃষ্ণ হাতি সিংহ তাদের অনুসরণ করতে করতে এগিয়ে চলে।

ভিক্টোরিয়া টার্মিনাশে বিশেষ একটা ট্রেন দিয়েছে যেটা তখন প্লাটফর্মে অপেক্ষা করছিল। ব্রিটিশ পুলিশ অফিসাররা অনেকেই গ্রেফতার করে নিয়ে আসছিল ওই ট্রেনটায়।‌ বিড়লা হাউস থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে গান্ধিজিকে। তাকে আলাদা একটা কম্পার্টমেন্টে রাখা হয়েছে, সঙ্গে রয়েছে তার সচিব মহাদেব। গ্রেফতার হয়েছেন সরোজিনী নাইডু, মোরারজি দেশাই, মৌলানা আজাদ, আসিফ আলি আরও অনেকে ‌। গান্ধিজিকে পাঠানো হচ্ছে পুনার আগা খান প্যালেসে। রাজা হাতি সিংহ যাবেন পুনার‌ ইয়েবডা জেলে। নেহরুকে পাঠানো হবে আহমদনগর ফোর্টে ।

বড় বড় নেতাদের গ্রেফতারের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। আর তারপরেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আইন অমান্য। ইন্দিরা এবং ফিরোজ বম্বে থেকে উত্তরপ্রদেশে ফিরে গিয়েছে। ইন্দিরা গিয়ে উঠেছে আনন্দ ভবনে। গায়ের রং রীতিমতো ফর্সা হওয়ায় অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানের ছদ্মবেশে ফিরোজ অবশ্য লখনউ চলে এসেছেন।

নেহরুদের বসতবাড়ি আনন্দভবন ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ফিরোজ এবং ইন্দিরা মার্চ মাসে বিয়ে হয়েছে আর তাদের এই অগস্ট মাসে নেপথ্যে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরুর এক মাসের ব্যবধানে ১৯৪২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাদের দু’জনকেই পুলিশ গ্রেফতার করা হল। সেদিনকার ঘটনা বড় অদ্ভুত যার জন্য একসঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিলেন ফিরোজ এবং ইন্দিরা দুজনেই।

প্রথমে দলীয় নির্দেশ মতো চুপিসারে ফিরোজ চলে গিয়েছিলেন‌ লখনউতে। এদিকে তখন ইতিমধ্যেই ফিরোজের নামেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। কিন্তু সে একেবারে আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে আন্দোলন সংগঠিত করতে লেগেছে।এমনই অবস্থা যে বেশ কিছুদিন ফিরোজের কোনও খবর পায় না ইন্দিরা। দুশ্চিন্তায় থাকে। তবে ইন্দিরার খবর ফিরোজের কাছে আসছিল। এই সময় একদিন স্থানীয় কলেজে সামনে কংগ্রেসের পতাকা তুলতে গিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হয় ইন্দিরা। সেই রাত্রে গোপনে এসে ইন্দিরার সঙ্গে দেখা করে ফিরোজ।

এর কদিন বাদেই আঘাত থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নিষেধ অগ্রাহ্য করে ইন্দিরা কংগ্রেস কর্মীদের একটা সভা ডাকেন । সেদিন তিনি তার বাবা এবং দলের অন্যান্য নেতারা কি অবস্থায় রয়েছেন তা জানানোর উদ্দেশ্যেই ওই সভাটি ডেকেছিলেন। ওই সভায় ইন্দিরার ভাষণ শুরু করতেই ব্রিটিশ ফৌজ গোটা সভাস্থল ঘিরে ফেলে। এক অফিসার ইন্দিরাকে ভাষণ থামাতে বলে হুমকি দেয় গুলি করা হবে বলে। ঠিক ওই সময় সভাস্থল থেকে একটি লোক দৌড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ইন্দিরা ও ওই ব্রিটিশ অফিসারের মাঝে। পলকে অবস্থাটা ধাতস্থ হতে ইন্দিরা খেয়াল করে ‌ লোকটি আর কেউ নয় ফিরোজ।আর ওই সভাসস্থল থেকেই গ্রেফতার হয় ফিরোজ এবং ইন্দিরা। তাদের দু’জনকেই পাঠানো হয় নৈনির‌ জেলখানায়।

ইন্দিরা পিসি বিজয়লক্ষী পন্ডিত একমাস আগেই গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিনি তখন নৈনি সেন্ট্রাল জেলে। মেট্রন এসে তাঁকে জানালো এবার এই জেলে ইন্দিরাও এসেছে। তার কিছুক্ষণ বাদে আরও পাঁচজন মহিলার সঙ্গে ইন্দিরা সেখানে আসে। অন্যদিকে পরের দিন আহমদনগর‌‌ জেলে বসে নেহরু যখন ভাবছিলেন ইন্দিরাকে একটা চিঠি লিখবেন তখন খবরের কাগজ থেকে জানতে পারেন ইন্দু গ্রেফতার হয়েছে। তার সঙ্গে ফিরোজও গ্রেফতার হয়েছে।

ওই জেলে থাকাকালীন ১৫ দিন অন্তর ফিরোজ ইন্দিরার দেখা হতো৷ এদিকে এরই মধ্যে এসে গেল ইন্দিরার ২৫ বছরের জন্মদিন। আবার সেদিনটা ছিল ইন্দিরা ফিরোজের পাক্ষিক দেখা হওয়ার দিন। জেল হাজতের মধ্যেও সেদিন এক চিলতে আনন্দে মন ভরে উঠলো জওহরকন্যা প্রিয়দর্শিনীর। তবে হ্যাঁ পরিবারের নিকটজনেরা জেলখানায় থাকলেও তাদের বেশিরভাগ লোকেরা একই জেলখানায় আছে এই কথা ভেবে ওই সময়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেতেন জওহরলাল।

ওই নৈনি জেলেই ফিরোজ ইন্দিরার প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর দিনটা কাটল। কিন্তু ১৯৪৩ সালের মার্চ অবধি রাখার পর ফিরোজকে সরিয়ে দেওয়া হল ফৈজাবাদ জেলে। একই জেলে থাকার দরুন সদ্য বিবাহিত ফিরোজ ইন্দিরার যেটুকু দেখার সুযোগ ছিল এবার সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। এদিকে কয়েক মাস আগেই জেলখানার স্যাঁতস্যাঁতে ঠান্ডা ঘরে থাকতে থাকতে ইন্দিরার প্লুরিসি হয়েছে। ক্রমশ তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে লাগলো। ১৯৪৩ সালের ১৩মে স্বাস্থ্যের অবস্থার কথা চিন্তা করে অবশ্য মুক্তি দেওয়া হল ইন্দিরাকে।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

করোনাকালে বিনোদন দুনিয়ায় কী পরিবর্তন? জানাচ্ছেন, চলচ্চিত্র সমালোচক রত্নোত্তমা সেনগুপ্ত I