সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : কৃষ্ণা বসু চলে গেলেন। আর জেল থেকে কাঁদলেন এক গ্রেফতার হওয়া সাংবাদিক। বললেন দ্বিতীয়বার মাতৃহারা হয়েছেন তিনি। জেলের গরাদ থেকে সুমন চট্টোপাধ্যায় বলেছেন কৃষ্ণা বসুর সঙ্গে তাঁর বহু স্মৃতিকথা।

আইকোর চিটফান্ড কাণ্ডে সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায় গ্রেফতার করে সিবিআই। মূলত আয় সঙ্গতি, তথ্য গোপন সহ একাধিক মামলায় গ্রেফতার করা হয় তাঁকে। ২০১৮ সালের শেষের দিকের ঘটনা। প্রায় দেড় বছর কেটেছে। জামিন মেলেনি। জেলের স্যাঁতস্যাঁতে ঘর থেকেই তিনি কৃষ্ণা বসুর স্মৃতিচারনা করেছেন। তা নিজের সোশ্যাল মাধ্যমে লিখেছেন , স্ত্রী কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়।

সুমনবাবু বলেছেন, ‘২০০০ সালে ডা: শিশির বসুর মৃত্যুর দিনে আমি সিঙ্গাপুরে ছিলাম। সেবার আমি প্রথমবার পিতৃহীন হয়েছিলাম। আজ সকালে কৃষ্ণা বসুর চলে যাওয়ার খবর পেলাম কয়েদখানায় বসে। এবার আমি দ্বিতীয়বার মাতৃহীন হলাম।’ বিশাল বড় ফেসবুক পোস্টে লেখা হয়েছে, শিশির বসুকে তিনি মেসোমশাই বলতেন, দ্বিতীয়জনকে মাসীমা! কিন্তু এই বসু দম্পতীর কাছে তিনি ছিলাম আগাগোড়া সন্তান-বিশেষ। নিজের বাবা-মাকে বাদ দিলে এঁদের দুজনের কাছে সারাটা জীবন তিনি যে অপত্য স্নেহ, আদর, আশ্রয় এবং প্রশ্রয় পেয়েছেন তা অন্যত্র কোথাও তা পাননি!

সুমনবাবুর স্মৃতিকথা অনুযায়ী ‘বসু-দম্পতীর বড় পুত্র সুগত আর আমি কলেজ জীবনে অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ছিলাম, সেই সূত্রেই ১৯৭৪ সাল থেকে আমার বসুন্ধরায় যাওয়া-আসা। তখন আমরা থাকতাম এই বাড়ি থেকে হাঁটা পথের দূরত্বে, দেওদার স্ট্রিটে।রোজ বিকেলে বসুন্ধরা ছিল আমাদের অনিবার্য আড্ডাস্থল, নীচের তলায় মেসোমশাইয়ের চেম্বারের ঠিক পাশের ঘরটিতে। ওটাই ছিল আমাদের নিজস্ব পার্লামেন্ট। শিশির বসু খ্যাতনামা শিশু চিকিৎসক, বিকেলবেলা বসুন্ধরার নীচের তলার ড্রয়িং রুমটি কচিকাঁচার কিচিড়-মিচিড়ে সরগরম থাকত, আমাদের গল্প-গুজবের আওয়াজ তার নীচে ঢাকা পড়ে যেত। মেসোমশাইয়ের সে ঘরে পদার্পণের কোনও প্রশ্ন ছিলনা, তবে মাসীমা কখনও কৌতুহলবশত, কখনও চা-জলখাবার লাগবে কিনা খোঁজ নিতে সে ঘরে ঊঁকি-ঝুঁকি দিতেন। তারপরে দিন গেলে আমিও কীভাবে যেন বসু-বাড়ির সদস্যই বনে গেলাম। যখন খুশি বেল বাজিয়ে ঢুকে পড়তে পারি, চেয়ে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া করতে পারি,মায় অনেক বেশি রাত হয়ে গেলে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়তেও পারি। ছেলেবেলা থেকেই সুগত পরিণত বয়স্কের মতোই আচরণ করত, মাত্রাজ্ঞান খোয়াতনা কিছুতেই। আমি ছিলাম স্বভাব-বখাটে, বাড়িতে মা, বসুন্ধরায় মাসীমা হাসিমুখে আমার দামালপনা সহ্য করতেন। মায়ের কাছে তবুও বা কখনও-সখনও চড়-থাপ্পড় খেয়েছি, মাসীমার কাছে কদাচ নয়।মারধোর দূরস্থান, এমন নরম প্রকৃতির মানুষ যে উচ্চস্বরে বকাঝোকাও করতে পারতেননা। না আমাকে না তাঁর তিন সন্তানের কাউকে।’

সাংবাদিকের কথায়, ‘বয়সের কারণে স্বাভাবিকভাবেই বিবিধ রোগ-উপসর্গ দেখা দিলেও মাসীমাকে তা কাবু করতে পারেনি কখনও। অশক্ত শরীর নিয়েও তিনি আজ লন্ডন তো কাল বস্টন করে বেরিয়েছেন, এমনি দুর্দমনীয় তাঁর মনের জোর।

বাঙালির কাছে সুভাষচন্দ্র বসু আজ যে সহজলভ্য হতে পেরেছেন তার পিছনে নীরব অবদান এই বসু দম্পতীর। নেতাজির উত্তরাধিকার জীবনের মূল্যে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা ছিল শিশির-কৃষ্ণার সারা জীবনের সাধনা! দু’জনে লিখেও গিয়েছেন নিরন্তরনা।মাসীমা জাত লেখক, তাঁর বাংলা গদ্য যেমন সুখপাঠ্য তেমনি নিজস্ব শৈলীর ওপর প্রতিষ্ঠিত।নেতাজিকে নিয়ে গবেষণা করেছেন অনেক পন্ডিত, কিন্তু জনতার সরণিতে তাঁক হাজির করিয়েছেন বসু দম্পতী, বিশেষ করে মাসীমা। নেতাজির বিচিত্র অ্যাডভেঞ্চারময় জীবনের এক অপরূপ আলেখ্য মাসীমার বই “চরণরেখা তব”, আমি বার তিনেক সেটা পড়েছি তো বটেই!’

এমন কাছের মানুষের মৃত্যুতে শোকাহত সাংবাদিক গরাদের ওপার থেকে বলেছেন, ‘গত চোদ্দ-মাসে আজই প্রথম মনে হল, পারলে গরাদ ভেঙে একছুটে কলকাতায় চলে যাই, দু’দন্ড গিয়ে দাঁড়াই মাসীমার পাশে, কাঁধে হাত রাখি সুগতর! হে ঈশ্বর আর কতো পরীক্ষা নেবে আমার, আর কতে আঘাত সইতে হবে এমন নিরালা অন্ধপুরীতে। ১৯৮৪-তে আমার মা যখন অকস্মাৎ চলে গিয়েছিলেন আমি কলকাতায় ছিলামনা! আজ আর এক মায়ের শেষ দর্শনেরও সৌভাগ্য হলনা আমার! সত্যিই আমি মহাপাতক।’