দেবময় ঘোষ, কলকাতা: তিনি বারবার বলতেন পাহাড় হাসছে৷ দার্জিলিং হাসছে৷ ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গে নিজের পার্টির ফলাফল দেখে নিশ্চিত ভাবেই হতাশ হবেন৷ উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, মালদহ উত্তর এবং মালদহ দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রে হার হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের৷ দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার – পাহাড়ে সমূলে উৎপাটিত হয়েছে ঘাসফুল৷ পাহাড় এবং উত্তরবঙ্গে গেরুয়া ঝড় বিজেপি প্রার্থীদের জয়ের ব্যবধান দেখেই বোঝা গিয়েছে৷

দার্জিলিংয়ে বিজেপি প্রার্থী রাজু বিস্ত চার লক্ষ ১৩ হাজার ৪৪৩টি ভোটে জিতেছেন৷ উল্লেখযোগ্য বিষয় ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দার্জিলিং কেন্দ্রে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনে বিজেপিই জয়লাভ করেছিল৷ তবে ব্যবধান ছিল এক লক্ষ ৯৭ হাজার ২৩৯৷ স্বাভাবিক ভাগেই প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি ভোট বাড়িয়েছে বিজেপি৷

পাহাড়ের রাজনীতিতে বিমল গুরুং যে গুরুত্ব হারাননি তা এই ফলাফলই স্পষ্ট করে দিয়েছে৷ পাহাড়ের রাজনীতি যাঁরা কাছাকাছি দেখেছেন, তাঁদের মতে, বিমল গুরুংয়ের বিরুদ্ধে রাজ্য সরকারের ‘অল আউট’ আক্রমণ পাহাড়ের মানুষ ভালো চোখে দেখেননি৷ ‘গোর্খাল্যান্ড’ দাবিদার বিমল দীর্ঘদিন পলাতক৷ লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই খবর রটেছিল – পাহাড়ে ফিরছেন গুরুং৷ কিন্তু ফেরেননি৷ বিমলের সহকারীদের বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে রাজ্য পুলিশ৷

সেই ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ পাহাড়ে ঘোষণা করে গিয়েছিলেন – গোর্খাদের পাশে রয়েছে বিজেপি৷ পাশে রয়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী৷ ‘গোর্খাল্যান্ডে’র দাবিকে বিজেপি কীভাবে দেখবে পাহাড়ে এখন তা কোটি টাকার প্রশ্ন৷ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই গোর্খাল্যান্ডে ‘অশনি সংকেত’ দেখছেন৷

দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রটি সাতটি বিধানসভা কেন্দ্র নিয়ে গঠিত৷ দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং (পার্বত্য এলাকা) এবং শিলিগুড়ি, নকশালবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া, চোপড়া (সমতল এলাকা)৷ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরুং গোষ্ঠী বিজেপি প্রার্থীকে সমর্থন করেছে৷ তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ বিনয় তামাং গোষ্ঠী মোর্চার প্রতীকসহ লড়াই করতে চেয়েও পারেনি৷ কারণ ভারতের নির্বাচন কমিশনের রেকর্ড অনুযায়ী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং এবং সম্পাদক রোশন গিরি৷ সেক্ষেত্রে আদালতে মামলা লড়েও দলের প্রতীক হস্তগত করতে পারেনি বিনয়৷ ঘাসফুল প্রতীকেই তাঁর প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়াই করতে হয়েছে৷

এই নির্বাচনের ফলাফল দেখেই বোঝা গিয়েছে পাহাড়ের মানুষ ঘাসফুল প্রতীকে আস্থা রাখেনি৷ একইসঙ্গে দার্জিলিং বিধানসভার উপনির্বাচনে বিজেপির প্রতীকে লড়াই করেছেন জিএনএলএফ প্রার্থী নিরজ তামাং জিম্বা৷ আর তৃণমূল সমর্থিত নির্দল প্রার্থী বিনয় তামাং৷ বিনয়ের হার পুনরায় প্রমাণ করেছে – পাহাড়ের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেস এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ করছেন না৷

নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রের সাতটি বিধানসভার মধ্যে ৬টিতেই ব্যাপক ব্যবধানে এগিয়ে ছিল বিজেপি৷ একমাত্র সংখ্যালঘু অধ্যুষিত চোপড়ায় কিছুটা পিছিয়ে পড়ে বিজেপি প্রার্থী৷ ধর্মীয় মেরুকরণের উত্তরবঙ্গে বিজেপির শক্তিবৃদ্ধির কারণ তা চোপড়ার ফলাফলেই বোঝা গিয়েছে৷ বাংলাদেশ লাগোয়া উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বিজেপি প্রচারের মূল ইস্যুই ছিল ছিল বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ৷ জলপাইগুড়ির কাওয়াখালির এসজেডিএ মাঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভায় ভিড়ের বহর দেখেই উত্তরবঙ্গের তৃণমূল নেতারা ‘গেরুয়া সংকেত’ পেয়ে গিয়েছিলেন৷ নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিল বা সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল যা এখনও আইন হিসাবে পাশ হয়নি – তা ভোটের আলোচনায় মূল বিষয় হয়ে ওঠে৷ পাশাপাশি আলোচনায় উঠে আসে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকরণ৷

উত্তরবঙ্গে ভোটের ফলাফল ব্যাখ্যায় দুটি কারণ উঠে এসেছে৷ এক, গোর্খাল্যান্ড৷ যা পাহাড়ের মূল ইস্যু৷ কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির জন্য ভবিষ্যতে তা উভয় সংকট তৈরি হতে পারে৷ মোদী-শাহ যদি গোর্খাল্যান্ডকে মান্যতা দেন তবে উত্তরবঙ্গের সমতলের মানুষ বাংলা ভাগকে মেনে নেবে না৷ বিজেপি মানুষের মন থেকে বিদায় নেবে৷ দুই, বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ৷ বিজেপি সরকার বাংলাদেশী বেআইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ না করতে পারলে সংখ্যাগুরু ভোটাররা বিজেপির থেকেও মুখ ফিরিয়ে নিচে দেরি করবেন না৷ সংখ্যাগুরু ভোটাররা চান না, মমতা যে ভুল করেছেন, সেই ভুলই আবার করুক মোদী-শাহ৷ উত্তরবঙ্গে বারবার গিয়েছেন মমতা৷ গত আট বছরে সুযোগ পেলেই ছুটে গিয়েছেন পাহাড়ে৷ পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য একাধিক ‘ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ তৈরি করেছেন৷ কিন্তু পাহাড়বাসীরা তাকে শূন্য হাতেই ফিরিয়ে দিয়েছেন৷

অনেকেরই ধারণা, ‘ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’-এর নামে জাতিগত ভাঙন সহ্য করেনি পাহাড়৷ উত্তরবঙ্গের ৮টি লোকসভা কেন্দ্রের একটিতেও সাফল্য আসেনি মমতার৷ পার্টির সংগঠনে ভাঙন ধরিয়েছেন মুকুল রায়, বিপুল টাকা ঢেলেছে বিজেপি, তৃণমূলের গুরুত্বহীন নেতারাই বিজেপিতে গিয়ে ‘সাবোটাজ’করেছেন৷ সিপিএম-ও চেয়েছে মমতাকে হারাতে৷ সেই করণেই পদ্মফুলে ভরসা দেখিয়েছে বাম শিবির – তা আড়ালে মেনে নিচ্ছেন তৃণমূলের নেতারা৷