দেবময় ঘোষ, কলকাতা: বিজেপি নেতারা বারবার ছুটে গিয়েছেন উডল্যান্ড হাসপাতালে। কারণ পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। জয় বন্দোপাধ্যায় থেকে মুকুল রায়, লকেট চট্টোপাধ্যায় থেকে কৈলাস বিজয়বর্গীয় দক্ষিণ কলকাতার এই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে রাজনৈতিক সৌজন্যতা দেখিয়েছেন। বাড়ি ফিরে গিয়েছেন বুদ্ধবাবু। কিন্তু সেখানে তিনি কেমন আছেন বা তাঁর চিকিৎসা কেমন চলছে, সেই নিয়েও রাজনৈতিক মহলে চর্চা চলছে। চিন্তিত বিজেপি নেতৃত্বও।

প্রশ্ন উঠেছে, অসুস্থ, শয্যাশায়ী বুদ্ধদেব রাজনৈতিক ভাবে এখনও এতটাই প্রাসঙ্গিক যে তাঁকেও ছেড়ে দিতে রাজি নয় অ-বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলি? নাকি শুধুই সৌজন্য রক্ষার খাতিরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কৈলাস বিজয়বর্গীয় বারবার বামপন্থি উপগ্রহের কক্ষপথে প্রবেশ করেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতিতে শুধুমাত্রই সৌজন্যতা রক্ষা অর্থহীন। তা কেউ করে না। তরকারিতে নুন না দিলে স্বাদ হয় কি?

আরও পড়ুন : বিক্রমের ভিতরের অবস্থা ঠিক কি, সেটাই ভাবাচ্ছে বিজ্ঞানীদের

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর খোঁজখবর নেন অনেকদিন ধরেই। একদিন কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারকে নিয়ে তিনি বুদ্ধবাবুর পাম এভিনিউয়ের দু’কামরার ফ্ল্যাটে গিয়েছিলেন। সেই ফ্ল্যাটের সংস্কারও করা হয়েছে। সচরাচর হাসপাতালে যেতে চাননা বুদ্ধ বাবু। তাই, রাজ্য সরকারের তরফ থেকে তাঁর ঘরেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এইসবই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্যোগ নিয়ে করিয়েছেন, তা অনেকেই জানেন। উডল্যান্ডেও সবার প্রথমে ছুটে গিয়েছিলেন মমতাই। অনেকেই এই সব কিছুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভোট রাজনীতি দেখেন। সেক্ষেত্রে এবার বিজেপিও পিছিয়ে থাকতে রাজি ছিল না। কারণ ভোট রাজনীতির পাটিগণিত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এখনও প্রাসঙ্গিক।

লোকসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল সিপিএম। এরাজ্যে বামশক্তি এর আগে এই দূর্দিনে দেখেনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামেদের প্রাপ্ত ২৬ শতাংশ ভোট শেষ লোকসভা নির্বাচনে ৭.৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ১২.২৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০.২৩ শতাংশ ভোট। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য কমিটিতে বারবার আলোচিত হয়েছে, বামফ্রন্টের ভোট, বিশেষ করে সিপিএমের ভোট আত্মসাৎ করেছে গেরুয়া শিবির।

হাসপাতালে অসুস্থ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিজেপি কিংবা মুকুল রায়-কৈলাস বিজয়বর্গীয়দের জন্য কেন এত রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক তা লোকসভার ভোটচিত্র দেখলেই সহজ বোধগম্য। মমতা অবশ্য লোকসভা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই বুদ্ধবাবুর খোঁজখবর নেন। বুদ্ধ বাবু সৎ রাজনৈতিক ব্যক্তিটি, তা প্রকাশ্যেই বলেছেন মমতা। সিপিএমের ‘সৎ’ নেতাদের দলে টানার নির্দেশও দিয়েছেন। যদিও লোকসভার ভোট বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, বামের অধিকাংশ ভোট রামেই গিয়ে পড়েছে। যা দেখে হতাশা ব্যক্ত করেছেন মমতাও।

আরও পড়ুন : পাৰ্ক স্ট্রিট কাণ্ডের পর ফের কলকাতা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরছেন দময়ন্তী সেন

এদিকে, সিপিএমের রাজ্য কমিটিতে আলোচনা হয়েছে, যাঁরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কঠিন কাজ হলেও পার্টি নেতৃত্বকে তা করতে হবে, কারণ মানুষগুলি মন থেকে বামপন্থীই রয়েছেন। রাজ্যে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় না থাকা সত্ত্বেও ৭-৮ বছর তারা পার্টি ছাড়েননি। তাদের বিজেপিতে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত ক্ষণস্থায়ী।

কিন্তু, ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিজেপি এবং তৃনমূল তাদের দীর্ঘায়িত রণকৌশলে বাম ভোটের হিসাব করতে শুরু করেছে। অতএব, অসুস্থ বুদ্ধ বাবুও রাজনৈতিক ভাবে প্রাসঙ্গিক।