সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: রাতারাতি মোদী বন্দনা মোদী নিন্দায় রূপান্তরিত হয়েছে৷ ২০১৪ সালের মে মাসের জনপ্রিয় নমো ২০১৬ সালের নভেম্বরে হয়ে উঠছেন যেন গণশত্রু৷ মঙ্গলবার ৫০০ এবং ১০০০ টাকা নোট অচল হওয়ার কথা ঘোষণার পর খোদ বড়বাজারের গদিতে গদিতে ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন অনেকেই৷ শুরু হয়েছে মোবাইল কানে হিসহাস-ফিসফাস৷ চলছে ফন্দিফিকির, কেমন করে এ যাত্রায় রক্ষা পাওয়া যায়৷ দমদম, বেলেঘাটা কিংবা যাদবপুরে মোদীকে গালাগালি করলেও না হয় বুঝতাম, কিন্তু খোদ বড়বাজারে গদিতে এমন কাণ্ড! আর তারপরে আরও অবাক হতে হয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একের পর এক ঘটনা দেখে৷ কোথাও চলছে দরাদরি, ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোটের লক্ষের তাড়ার বদলে ১০০-র নোটের ৭০ না ৬০ হাজারের বান্ডিল মিলবে, তা নিয়ে ৷

moneyএর মধ্যেই খবর, দেশের কোথাও বা স্তূপাকারে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বস্তা বস্তা নোট৷ দেখে মনে হয়, আজও কী বিচিত্র এই দেশ! কিছু মানুষের কেন এমন অদ্ভূত মানসিকতা, হাজারের বদলে ৬০০ কিংবা ৭০০ টাকা পেলেও তা বদলে নেয়, না পোষালে টাকা পোড়াতেও পিছপা হয় না৷ কিন্তু ৩০ শতাংশ কর তারা কিছুতেই দিতে রাজি নয়৷ এরাই আবার অন্য সময় দেশপ্রেমের বড়াই করে, চিনের মাল বর্জনের আওয়াজ তোলে৷

আড়াই বছর আগে দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার আগে কালো টাকা উদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েও ব্যর্থ হন মোদী৷ বরং তাঁরই আমলে ব্যাংকগুলি থেকে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ করে দেশ ছেড়ে পালান লিকার ব্যারন বিজয় মালিয়া৷ এমন সময়ই তাঁর মরিয়া পদক্ষেপ যেন ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত৷ কিছুদিন আগেও কর দিয়ে এই লুকানো টাকা প্রকাশ করে দেওয়ার একটা সুযোগ দিয়েছিল মোদী সরকার৷ কেউ কেউ তখন দিলেও যাঁরা তার পরেও তা গোপন করেছেন তাঁদের তো এখন ভুগতে হবেই৷

modi
বহুদিন ধরেই সন্ত্রাসবাদের মদতদাতারা সীমান্তপারে বসে খুব সংগঠিতভাবে ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে জাল নোট ছড়িয়ে দিচ্ছে৷ দুদিন আগে মোদী নিজের মুখেই ঘোষণা করেন, মূলত সেই নেটওয়ার্ককে ভাঙার জন্য সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত৷ যারা হেরাফেরি করছে, তারা অন্তত তাদের হাতে-থাকা নোটগুলি আর কাজে লাগাতে পারবে না ৷ উপরন্তু, কালো টাকা উদ্ধারের বিকল্প আর কোনও রাস্তা রয়েছে কি না বলা মুশকিল৷ বিদেশে যা পাচার হয়েছে সেই টাকা ফেরত আনা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকানুনের উপরও৷ যে কারণে ব্রিটেনকে হাজারবার বলেও ভারত হাতে পাচ্ছে না বিজয় মালিয়া সহ অন্তত ৫৭ জন ফেরারিকে৷ ফলে চেষ্টা করেও যে কোনও পার্টির সরকারই সেক্ষেত্রে কতটা সফল হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন রয়েছে৷ তবে কালো টাকা তো শুধু বিদেশি ব্যাংকে নেই৷ তা দেশের আনাচে কানাচেও ছড়িয়ে রয়েছে৷ সোনায়, বেনামী সম্পত্তিতে, পাশাপাশি লুকিয়ে রয়েছে নগদেও৷ মোদীর সিদ্ধান্তে ধাক্কা খাবে সেই লুকিয়ে রাখা নগদও৷ ধাক্কা খাবে কালো টাকা-নির্ভর সমান্তরাল আর্থিক কাঠামো৷

moneyবহুদিন ধরেই আবাসন ও নির্মাণ শিল্প সহ নানা ক্ষেত্রে পাইকারি ও খুচরো লেনদেন অনেকাংশেই হয় নগদ টাকায়৷ এটা অনেকেরই অজানা নয়৷ এবার পুরানো নোট এক রাতেই অচল হওয়ায় এইসব ক্ষেত্রে কালো টাকার চলাচল আঘাত পাবে৷ ফলস্বরূপ এই সমান্তরাল আর্থিক কাঠামোয় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য৷
বেশ কয়েক বছর ধরেই মূলত পরিকাঠামোর অভাবে গোটা দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে প্রধানত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছে ভারত সরকার৷ কোনও কোনও স্বার্থন্বেষী মহল আবার এই উদ্যোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহও করছে৷ কারণ, তাহলে তাদের কাছে কালো ধন আসা আটকে যাবে৷ ফলে ব্যাংকে জিরো ব্যালান্স অ্যাকাউন্ট খুলেও তাতে টাকা রাখতে যাচ্ছে না অনেককেই৷ চেক ব্যবহারের ব্যাপারে আগ্রহের অভাবেও বহু মানুষকে ভুগতে হচ্ছে আজকের এই সিদ্ধান্তের জন্য৷ আবার কোনও অনুষ্ঠানে মোটা অংকের টাকা (যেমন অনুষ্ঠানস্থল, ক্যাটারার ইত্যাদি ক্ষেত্রে) হলেও টাকা দেওয়া হচ্ছে নগদে৷ এইসব লেনদেনও কেন চেকে নয়, এই প্রশ্নটাও তোলা দরকার৷ এর কারণ, যিনি নিচ্ছেন তিনি ওই আয়ের টাকা দেখাতে চান না৷ আবার যিনি দিচ্ছেন তিনিও যে সব সময় শুধুমাত্র পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে এটা মেনে নিচ্ছেন এমন নয়৷ কারণ অনেক সময় যিনি দেন তিনিও তাঁর খরচের উৎস না জানানোর উদ্দেশ্যে তা করে থাকেন কিংবা ওই খরচের ক্ষেত্রেও কর বাঁচাতে তা করেন৷ কারণ, টাকা চেক মারফত দিলে গ্রহীতারা জানিয়ে দেন বেশি লাগবে করের জন্য ৷
শুধু শিল্প বাণিজ্যমহল নয় রাজনৈতিক দলগুলিও কালো টাকার উপর নির্ভরশীল৷ বেশিরভাগ দলই আয়ব্যয়ের সঠিক হিসেবে দাখিল করে না এবং কারা দলগুলিকে এই টাকা দেয় তাও উহ্য রাখা হয় ৷ তার মানেই বুঝতেই পারা যায় গোটা বিষয়টাই কেমন গোলমেলে৷ সেক্ষেত্রে নতুন পদক্ষেপে হয়তো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় খানিকটা স্বচ্ছতা আসতে পারে৷
৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট অচল করে প্রধানমন্ত্রী মোদী শুধু অন্য দল নয়, রীতিমতো চিন্তায় ফেলে দিয়েছেন তাঁর নিজের দলের লোকজনকেও৷ সামনেই উত্তরপ্রদেশ, পাঞ্জাব সহ পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন৷ ভোট কেনার জন্য তো প্রচুর টাকা দরকার৷ আর সেটা অবশ্যই কালো টাকা৷ ফলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা তাঁর নিজের দলকেও দুশ্চিন্তায় ফেলেছে৷ পাশাপাশি এমন সিদ্ধান্তের জেরে জনগণের উপর কতটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে তা নিয়েও চিন্তিত বর্তমান শাসককুল৷ কারণ, এর জেরে কয়েক দিন ধরে সাধারণ মানুষকেও হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে৷ ব্যাংক থেকে পুরানো টাকা বদলে নতুন নোট দেওয়া শুরু হলেও তা নিয়ে অশান্তি হলে ভোটবাক্সে তার প্রভাব পড়তে পারে বলেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শাসককুলের অনেকেই৷ ফলে তাঁদেরও অনেকে এখন প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও যে জল মাপতে বসবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ ফলে এমন প্রায় যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তে রাজনৈতিকভাবে ব্যুমেরাং হতে পারে মোদী ৷ রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, মমতা বন্দোপাধ্যায়, মায়াবতী, মুলায়ম সিং যাদব , সীতারাম ইয়েচুরিরা শুধু নন, যেহেতু খোদ ব্র্যান্ড মোদীর ভক্ত-অনুগামীরাও মওকা বুঝে আঙুল তুলতে পারেন তাঁর বিরুদ্ধে৷ অর্থাৎ, কংগ্রেস-বাম-তৃণমূলের অন্দরমহল শুধু নয়, খোদ মোদীভক্তদের অস্থিরতার চাপ আগামী কয়েক মাস ধরে সহ্য করতে হবে তাঁকে৷ সুতরাং, নিন্দুকেরা যা-ই বলুন, মোদীর যে এটা একটা অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷

gana-1হেনরিক ইবসেনের বিখ্যাত নাটক “An Enemy of the People” অবলম্বনে ১৯৮৯সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায় পরিচালিত বাংলা ছবি ‘গণশত্রু’৷ সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণি নিজেদের স্বার্থরক্ষা ও মুনাফার জন্য সাধারণ মানুষের কুসংস্কারকে কেমন করে ব্যবহার করে সেটাই ওই সিনেমায় তুলে ধরা হয়েছিল৷  চরণামৃতের নামে যে দূষিত জল পান করছে মানুষ বৈজ্ঞানিকভাবে তা তুলে ধরে বিরোধিতা করেছিলেন অশোক গুপ্ত (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়) নামের এক চিকিৎসক৷ এর পরেই তাঁকে স্বার্থান্বেষীরা গণশত্রুর তকমা দিয়ে দেয়৷ ডাক্তারের সভা ভণ্ডুল করে তাঁকে অপদস্থ করা হয়৷ ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে মরিয়া মোদী অবশ্য ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে নয়, আর্থিক কারণেই যেন হয়ে উঠছেন সে রকম গণশত্রু৷ যদিও তাঁর নিজের দল বিজেপি এবং মূল সংগঠন আরএসএস বরাবরই ধর্ম এবং দেশপ্রেমের জিগির তুলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করে থাকে ৷ বাংলাদেশ যুদ্ধের পর চরম জনপ্রিয় ইন্দিরা গান্ধীও জরুরি অবস্থা জারি করে সিংহাসন হারিয়েছিলেন৷ জরুরি অবস্থা নিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় এবং তাঁর পরাজয়ের পর একে একে নিজের দলের ভক্ত নেতারাও তাঁকে ছেড়ে চলে যান৷ এবার ৫০০ এবং ১০০০-এর নোট রাতারাতি অচল করায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীরও তেমন দশা হবে কি না সেটা ভবিষ্যৎই বলতে পারে৷
তবে এটাও ঠিক, যাঁরা এতদিন তাঁর বিরোধী ছিলেন, যাঁরা ক‘দিন আগেও সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে হাসাহাসি করেছেন তাঁদের একটি বড় অংশই তাঁর এই নোট অচলের সিদ্ধান্তে খুশি৷ যা দেখে মনে পড়ছে ‘গণশত্রু’ ছবির অন্তিম দৃশ্যের কথা, যেখানে এস্টাবলাবিশমেন্টের হাতে পর্যুদস্ত-লাঞ্ছিত ডাক্তার গুপ্ত আভাস পেলেন, সত্যি সত্যিই তাঁর কথা শুনতে তখনও আগ্রহী একদল মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম৷ আবার শুরু নতুন করে সভা করার তোড়জোড়৷