সুমন বটব্যাল, কলকাতা: শাসকের বিরুদ্ধে গেলেই নির্যাতনের মুখে পড়তে হবে৷ বাংলায় পুলিশ ও শাসকদলের বিরুদ্ধে এহেন ট্র্যাডিশনের অভিযোগ নতুন নয়৷ এই ট্র্যাডিশন চলে আসছে সেই সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের জমানা থেকেই৷ তখন পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে বাংলা জুড়ে স্লোগান উঠেছিল- ‘পুলিশ তুমি যতই মারো, তোমার মাইনে ১১২’৷ অর্থাৎ শাসকদলকে ‘খুশি’ করতে যতই মারো, বেতন একই থাকবে৷ বাড়বে না!

জ্যোতি-বুদ্ধ হয়ে এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানা৷ পরিবর্তনের সরকার৷ কিন্তু পুলিশি আচরণে পরিবর্তন ঘটল কই? গত শনিবার ও সোমবার বর্ধমান শহরে পুলিশের হাতে দু’জন সাংবাদিকের নিগ্রহর ঘটনা অন্তত এই প্রশ্নকে আরও উস্কে দিয়েছে৷প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, ‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে পুলিশের আচরণ বদলালো কই?

দুটি ক্ষেত্রেই অদ্ভূত মিল৷পুলিশি অত্যাচার কিংবা পুলিশি জুলুমের ছবি তুলতে গিয়ে খাঁকি উর্দির ‘রোষানলে’র মুখে পড়েছেন সাংবাদিকদ্বয়৷শনিবার এক সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়েছিল৷ পদস্থ পুলিশ কর্তার হস্তক্ষেপে ৩০ ঘণ্টা পর মোবাইল ফিরে পেলেও, পুলিশি হয়রানির ছবি তাঁর মোবাইল থেকে রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ হয়ে গিয়েছে!

সোমবারের ঘটনা আরও ভয়ঙ্কর৷ পুলিশি লাঠিচার্জের ছবি মোবাইল বন্দী করার ‘অপরাধে’ মারধর করে লকআপে ভরা হয়েছে কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির দৈনিকের এক সাংবাদিককে৷পরিচয়পত্র দেখিয়েও রেহাই মেলেনি৷এই প্রথম নয়, জেলায় জেলায় তো বটেই এর আগে তিলোত্তমা কলকাতাও একাধিকবার সাক্ষী থেকেছে, কিভাবে নাকাবন্দী করে সাংবাদিকদের পিটিয়ে ‘সবক’ শেখানোর পুলিশি চেষ্টার৷

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের চেহারাটা এমন হলে, সাধারণ মানুষের হালটা কেমন? ‘ভিভিআইপি’র জেলা সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার নামে পুলিশি ‘বাড়াবাড়ি’ নিয়ে অতীতে বিরোধী দলনেত্রী হিসেবে একাধিকবার সোচ্চার হতে দেখা গিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ ক্ষমতায় বসার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পুলিশের এই ‘বাড়াবাড়ি’-তে লাগাম পরানোর চেষ্টাও করেছেন তিনি৷

প্রকাশ্যেই একাধিকবার তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘ভিভিআইপি’-র নিরাপত্তার নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা যাবে না৷ মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র দফতরের দায়িত্বেও তিনি৷ কিন্তু পুলিশ তাঁর কথা শুনছে কই? শনিবারের ঘটনার কথাই ধরা যাক৷ শনিবার বিকেলে তৃণমূলের ‘যুবরাজ’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয় বর্ধমান-কালনা রোড দিয়ে বর্ধমান স্টেশন হয়ে বর্ধমান-বীরভূম রুটে যাওয়ার কথা ছিল৷‘ভিভিআইপি’-র অজুহাত দেখিয়ে বিকেল ৩টে থেকে বর্ধমান স্টেশন চত্বর থেকে বর্ধমান-বীরভূম, বর্ধমান-কালনা, এমনকি স্টেশন থেকে নবাবহাট যাওয়ার রাস্তাও পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়৷ শুধু বাসই নয়, রিকশা, এমনকি বাইক চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল৷ ফলে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ হয়ে যায় বর্ধমান শহর

প্রশাসন সূত্রের খবর, অভিষেকের সফরকে কেন্দ্র করে এভাবে জেলা পুলিশ-প্রশাসনের পক্ষ থেকে এভাবে ঘণ্টা তিনেক শহরকে অবরুদ্ধ করে রাখার কোনও নির্দেশই ছিল না৷ অভিযোগ, তবু বর্ধমান ট্রাফিক ওসি চিন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে চলে শহরকে অবরুদ্ধ করে রাখার এই কর্মযজ্ঞ৷ স্বভাবতই, বিভিন্ন কাজে শহরে এসে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় আমজনতাকে৷ স্টেশন চত্বরে মানুষের এহেন দুর্ভোগের ছবি তোলার ‘অপরাধে’ kolkata24x7 এর প্রতিনিধি মানব গুহ-র মোবাইল কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন ট্রাফিক ওসি চিন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়৷

বর্ধমান থানায় ট্রাফিক ওসির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জানান মানববাবু৷ ৩০ ঘণ্টা মোবাইলটি নিজের হেফাজতে ‘বেআইনি’ভাবে আটকে রাখার পর ডিএসপি (ট্রাফিক) এর হস্তক্ষেপে রবিবার রাতে তিনি ফোনটি ফেরৎ দেন বর্ধমান থানায়৷ দীর্ঘক্ষণ মোবাইল আটকে রাখা হলেও কোনও সিজার লিস্ট দেওয়া হয়নি৷মোবাইল হাতে পেয়ে মানববাবু দেখেন পুলিশের খামখেয়ালীপনায় মানুষের দুর্ভোগের যে ছবিগুলি তিনি তুলেছিলেন, তা বাইরে থেকে সফটওয়ার ব্যবহার করে ‘ডিলিট’ করে দেওয়া হয়েছে৷ ঘটনার সময় ট্রাফিক ওসি চিন্ময়বাবুর বুকে ‘bodycam’ লাগানো ছিল৷ মানববাবুর কথায়, ‘‘সেদিন ঠিক কি ঘটেছিল, পুলিশ কর্তারা চাইলে অনায়াসে ওই ‘bodycam’ এ তা দেখতে পারেন৷

অন্যদিকে সোমবার বর্ধমান থানা চত্বরে পুলিশের লাঠিচার্জের ছবি মোবাইলে বন্দী করার ‘অপরাধে’ কলকাতা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির দৈনিকের সাংবাদিক শ্রীকান্ত পড়্যাকে বেধড়ক মারধর করে টেনে হিঁচড়ে লক আপে ঢুকিয়ে দেয় পুলিশ৷ দীর্ঘক্ষণ তাঁকে লক আপে আটকে রাখা হয়৷ পরিচয়পত্র দেখিয়েও কোনও কাজ হয় নি৷মঙ্গলবার ওই সাংবাদিক বর্ধমান থানায় এফআইআর দায়ের করেন। এফআইআরে আহত ওই সাংবাদিক জানান, তিনি তাঁর পরিচয়পত্র দেখালেও এবং বর্ধমান থানায় হাজির থাকা আইসি তুষারকান্তি করের বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও তার উপস্থিতিতেই বর্ধমান থানার সাব ইন্সপেক্টর শ্রীধর সেন, এএসআই সনাতন চট্টোপাধ্যায় এবং কনষ্টেবল অরবিন্দ দে তাঁকে মারধোর করে লকআপে ঢুকিয়ে দেয়।

অবশেষে জেলা পুলিশ সুপারের নির্দেশে অভিযুক্ত তিন পুলিশ কর্মীকে ‘ক্লোজড’ করে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে৷ পুলিশ সুপার কুণাল আগরওয়াল বলেন,‘‘ঘটনাটি খুবই নিন্দনীয়৷ অভিযুক্ত তিন পুলিশ কর্মীকে ক্লোজড করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু হয়েছে।’’ অন্যদিকে মঙ্গলবার রাতে বর্ধমানের ডিএসপি ট্রাফিক মানববাবুকে ফোন করে ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন৷দেখা করতে বলেছেন

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, ‘জুতো মেরে গরু দানে’র মতো সাংবাদিককে নিগ্রহ করে ‘ক্ষমা’ চাওয়ার অর্থ কি? কবে বন্ধ হবে বিরুদ্ধে গেলেই সাংবাদিক ‘পেটানোর’ পুলিশি ট্র্যাডিশন?