সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: আজকাল প্রায়ই ছাত্রবিক্ষোভ ঘিরে উত্তাল হয় বিভিন্ন কলেজ। এদের মধ্যে এখন প্রথম সারিতে অবশ্যই প্রেসিডেন্সি এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু ছাত্রদের ব্যপার, তারা আজও যেমন অতীতেও তাদের মানসিকতা একইরকম রয়েছে শুধু বিক্ষোভের ধরন এবং পথ বদলে গিয়েছে আর বদলেছে সময়। বিদ্যাসাগরকেও সম্মুখীন হতে হয়েছিল এমন এক ছাত্র বিক্ষোভের। তবে এক্ষেত্রে ঘটনা ভারি মজার।

দুই কলেজের ছাত্রদের মধ্যে এমন ‘লাঠালাঠি’ লাগত যে পুলিশ না আসা পর্যন্ত চলতেই থাকত মারামারি। তারপর পুলিশ এসে ঘা কতক দিলে সব শান্ত হয়ে যেত। এমনই এক ঘটনার মুখে বিদ্যাসাগর। তিনি তখন মেট্রোপলিটন কলেজের অধ্যক্ষ।

মেট্রোপলিটনের সঙ্গেই পাশের এক কলেজের কোনও এক কারণে ঝগড়া লেগে যায়। রীতিমত এই মারে কি সেই মারে অবস্থা। গুন্ডা ভাড়া করে এনে মারামারির প্রস্ততি হয়ে গিয়েছে। এবার ঘটনা হল যা ঘটনার ধারে কাছে নেই তারা পড়েছে সমস্যায়। না এগোতে পারে না পিছোতে পারে। বসেই রয়েছে কলেজের মধ্যে।

সেদিন বিদ্যাসাগর অসুস্থ ছিলেন। তাই তিনি কলেজে ছিলেন না। ঘটনার খবর কানে পৌঁছতেই তিনি আর দেরী করেননি সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে যান কলেজে। কলেজে পৌঁছেই একদম গুণ্ডাদের মুখোমুখি। একদম প্রথম সারিতে যে দাঁড়িয়ে ছিল তাকেই ডেকেই নিলেন। পায়ের খরম খুলে হাতে নিলেন। ক্রোধ এতটাই ছিল যে প্রায় মেরে দিতেন খরমের বাড়ি। সামলে নিয়ে বিদ্যাসাগর তাকে বলেছিলেন, ‘আমার কলেজের ছেলেদের তোরা মারবি? এত সাহস!’ ’

সামনে বিদ্যাসাগর। তাও খরম হাতে। বিদ্যাসাগরের এমন রুদ্র মূর্তি দেখে বোধহয় ভয় পেয়ে গিয়েছিল কিংবা নামটা বিদ্যাসাগর বলেই সমস্ত বেয়াদপি হাওয়া হয়ে গিয়েছিল সেই রনমূর্তিধারী ছাত্রের। কোনও উত্তর না দিয়ে বিদ্যাসাগরকে একটা প্রণাম ঠুকে নেয়। তারপর আর কোনওদিকে না দেখে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল সে। ‘নেতার’ পলায়ন দেখে অন্য গুন্ডারাও ভ্যানিশ।

প্রসঙ্গত কলেজে কলেজে সংঘর্ষের জেরে গঙ্গা বইত এমন দিনও দেখেছে কলকাতা। আজ থেকে কম–বেশি দেড়শো বছর আগেও চিত্রটা প্রায় একই ছিল। সবথেকে বেশী কাঠে কাঠে লাগত সংস্কৃত ও হিন্দু কলেজের।

সংস্কৃত কলেজের ছাত্ররা ইট–পাটকেল জোগাড় করে রাখত কলেজের ছাদে। মারামারি শুরু হলে উপর থেকে ছুড়ে মারত। ‘সমাচারচন্দ্রিকা’ পত্রিকার ১৮৬২–র ৩০ অগস্ট সংখ্যায় লেখা, ‘হিন্দু কালেজ ও সংস্কৃত কালেজের কতিপয় ছাত্র বিরোধী হইয়া পথিমধ্যে পরস্পর দাঙ্গা করিয়াছে।’ এই খবরেই জানা যায় সংস্কৃত কলেজের ছেলেরা হেরে যায় সেই লড়াইয়ে। হারের কারণ কি ? সংবাদপত্রে নাকি লেখা হয়েছিল “হিন্দু কালেজের ছাত্রেরা তেজস্বী বিশেষতঃ ধনী ভাগ্যধর লোকের সন্তান।”

তথ্যসূত্র : অভিক দে