সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: তিনি লাঠি খেলায় পারদর্শী ছিলেন। তবু কখনোই পথে নেমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করেননি। কিন্তু সুবক্তা বিবেকানন্দ গোড়াদের জবাব দিয়েছেন বহুবার। তবে হাতে নয় পাতে। অর্থাৎ কথার প্যাঁচে এমন ফেলতেন যে অপরদিকের ব্যক্তিত্ব পরে মুখ লোকানোর জায়গা পেত না। বিদেশে পড়াশোনা করতে গিয়ে বর্ণবিদ্বেষী এক ইংরেজ অধ্যাপককে এমন ভাবেই ‘পাতে’ মেরেছিলেন তিনি।

সে সময় ভারতীয়দের প্রায়ই বর্ণবিদ্বেষের শিকার হতে হত। আজকে বর্ণবিদ্বেষ নিয়ে বিশ্ব জুড়ে হইচই। মুহূর্তে এমন কোনও ঘটনা ঘটলেই তা ‘ভাইরাল’ হয়ে যায়। কিন্তু উনিশ শতকে এসব কিছুই ছিল না। কেউ সহ্য করে নিতেন। কেউ সহ্য করতে না পারলে হাত পা চালিয়ে গ্রেফতার হতেন। কিন্তু বিবেকানন্দ? তিনি অন্য ধাতুতে তৈরি। কথায় মারতেই পছন্দ করতেন। ঘটনা স্বামী বিবেকানন্দের লন্ডনে ল কলেজে পড়াশোনার সময়। বিদেশী নাকওঁচা গোড়া অধ্যাপক পিটারস বাদামি বর্ণের মানুষ দেখলেই অপমান করতেন। বলা যায় অপমান করে তিনি মজা পেতেন। স্বামীজির তিন ‘ঘা’ এবং কুপোকাত অধ্যাপক।

দুপুরের খাবার সময়। ক্যান্টিনে থেকে খাবার নিয়ে স্বামীজি এসে বসলেন বর্ণবিদ্বেষী অধ্যাপকের পাশেই। পিটার নামে ওই অধ্যাপকের যা অভ্যাস তা যথারীতি তিনি করলেন। পিটারস বলেছিলেন “আপনি কি জানেন না যে একজন শুয়োর আর একটা পাখি, একসাথে বসে খাবার খেতে পারে না।” স্বামীজি কথাটা শান্তভাবে শুনলেন। তাঁর পালটা উত্তর ছিল অত্যন্ত শান্ত গলায়। স্বামীজি বললেন, “চিন্তা করবেন না, আমি পাখি হয়ে উড়ে যাব।” এই কথা বলে বিবেকানন্দ অন্য টেবিলে বসে খেতে শুরু করেন। এই ঘটনায় অধ্যাপক রেগে লাল। প্রতি মুহূর্তে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন।

কিছুদিন পর আবারও মুখোমুখি পিটারস এবং স্বামীজি। স্বামীজি কিছু বলেনওনি। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকা অধ্যাপক এক প্রকার গায়ে পড়েই স্বামীজিকে জিজ্ঞেস করলেন “ধরুন আপনি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। রাস্তায় দুটি ব্যাগ পড়ে আছে। একটিতে জ্ঞান, অন্যটাতে টাকা রয়েছে। আপনি কোন ব্যাগটি তুলে নিয়ে আসবেন?” স্বামীজির পত্রপাঠ উত্তর, “আমি অবশ্যই টাকার ব্যাগটি তুলে নিয়ে আসতাম।” স্বামীজির এমন উত্তরে ঘরের প্রত্যেকেই খুব অবাক। অধ্যাপক ভাবলেন এই সুযোগ। খাপে পড়েছে বাছাধন। ব্যঙ্গ করে বললেন “আমি হলে অবশ্যই জ্ঞানের ব্যাগটা তুলে আনতাম।” স্বামীজি যথারীতি ছক্কা হাঁকালেন। তুলে ফেললেন লাল মুখো সাহেবকে মাঠের বাইরে। ফের নিজস্ব বাচনভঙ্গিতে উত্তর দিলেন। বললেন “সেটাই স্বাভাবিক। যার কাছে যেটা নেই সে তো সেই ব্যাগ তুলে আনবে।” অধ্যাপকের মুখ রাগে লাল থেকে বেগুনি হওয়ার উপক্রম। বিবেকানন্দ ফের ব্যস্ত হলেন নিজের কাজে।

এতেও শখ মেটেনি পিটারসের। খানিকটা ‘বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না’ অবস্থা আর কি। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে অধ্যাপক। চেষ্টা করলেন স্বামীজির স্টাইলে খেলার। স্বামীজির উত্তর পত্রে ‘ইডিয়েট’ লিখে দেন। এবারেও আত্মঘাতী গোল অধ্যাপকের। স্বামীজির অসাধারণ উত্তর। তিনি বলেছিলেন “স্যার আপনি খাতায় সই করেছেন কিন্তু আমার প্রাপ্ত নম্বর দিতে ভুলে গিয়েছেন।” অধ্যাপক আবারও কুপোকাত।