দেবময় ঘোষ: অনেক কিছুই মিলল না। ‘স্পিডব্রেকার দিদি’ ‘চৌকিদার মোদী’কে রাজ্যে আমন্ত্রণ জানালেন। জন্ম হলো কিছু প্রশ্নের। সারদা-নারদা তদন্তের ভবিষ্যৎ কী? পশ্চিমবঙ্গে NRC হবে কী? আরও বেশ কিছু।

কয়েক মাস আগের কথা। এপ্রিল-মে মাস। লোকসভার ভোটপর্ব চলছে। প্রচারও চলছে তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প অস্বীকার করে মমতা বঙ্গবাসীকে ধোকা দিচ্ছেন – অভিযোগ করলেন মোদী। বললেন দিদি এখন স্পিডব্রেকার দিদি। সঙ্গে সঙ্গেই হেডলাইন। পালটা ফিরিয়ে দিয়েছেন মমতাও। গুজরাট দাঙ্গার প্রসঙ্গ তুলে কখনো মোদীকে দাঙ্গাবাজ বা কখনও ‘নোটবন্দির নায়ক’ বলেছেন

তবে মমতা বুধবার দিল্লিতে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, নির্বাচনের পরেই তিনি মোদীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। দূরত্ব সাময়িক। প্রশাসনিক নয়। বলেছেন, ২০১৪ সালেও গিয়েছিলেন। এবারে, শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলে যেতেন। সেই ঘটনা আর কিছুই নয়, রাজ্য থেকে নিহত বিজেপি সদস্য দের পরিবার মোদীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন। সেই কারণেই মুখ্যমন্ত্রী মোদীর শপথে যাননি। তবে এতদিন মোদীর বিপুল জয়কে মান্যতা দিতেন না। বলতেন, ইভিএম সন্দেহজনক। মঙ্গলবার অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই সাক্ষাৎ একটি নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে অন্য নির্বাচিত সরকারের। অতএব, মোদী যে নির্বাচিত, ইলেকশন যে সিলেকশন নয়, তা তিনি জানিয়েছেন।

আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই একটি মতামত প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাজনৈতিক ভাবে কঠোর বিরোধীদের সারা বছর, বিশেষ করে নির্বাচনের সময় মুখোদর্শন করতে নেই। পরে দেখা করলেও চলবে। যে কোনও প্রকারে। তবে সাংবাদিক হিসাবে প্রশ্ন করার অধিকার থেকেই জিজ্ঞাসা করছি, রাজ্যের দেনা যদি উনি চাইতেই যেতেন, তবে নীতি আয়োগের বৈঠকে না গিয়ে একলা গেলেন কেন?

মাওবাদী এলাকা রয়েছে এমন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বৈঠক করলেন। জেলা সফর আছে, গেলেন না মমতা। কিন্তু বৃহস্পতিবারই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চান তিনি। যুক্তি, দিল্লিতে এলে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে যান। অর্থাৎ, রাজ্যের প্রয়োজনে তিনি বৈঠকে যাবেন না, অথচ নিজের ইচ্ছায় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। সারা দেশের জন্য এক নিয়ম থাকবে, তাঁর জন্য আলাদা নিয়ম। তাঁর এই চিন্তাভাবনা রাজ্যের কতটা ভালো করবে, তা নিশ্চয়ই তিনি ভেবে দেখবেন।

কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের জন্য দাবি আদায় করতে কোনও মুখ্যমন্ত্রী যে একাই দিল্লি যান না, এমন নয়। এমন বহু উদাহরণ আছে। অনেক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীই যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এই ক্ষমতা ব্যবহার করেন। কিন্তু তাঁরা প্রধানমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে ক্ষুদ্র কারণে অনুপস্থিত থাকেন না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একা দেখা করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের কী বাড়তি সুবিধা করে দিয়েছেন, তা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা চলবে।

ভোটের সময় ফণী ঘূর্ণিঝড় এসেছিল। ভোটের কথা ভেবে প্রধানমন্ত্রীর ফোন ধরেননি মমতা। সাংবাদিক রাজদীপ সারদেশাইকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় সেকথা স্বীকারও করে নিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন নবীন পট্টনায়কের ভোট হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে কথা বলেছেন, কারণ ওড়িশার ভোট হয় গিয়েছে। শুধু মাত্র রাজনীতির কথা ভেবে প্রশাসন কে এই স্তরে নিয়ে গিয়ে রাজ্যের কি উপকার মমতা করতে পেরেছিলেন কেউ জানে না হয়তো। তবে, ইভিএম খোলার পর দেখা গিয়েছে, তিনি ১৮ টি আসন হারিয়েছেন।

সেই কারণেই কট্টর মমতা বিরোধী বলে পরিচিত, মুকুল রায় এবং অধীর চৌধুরী বুধবার নানা কোণ থেকে তাঁকে বাক্যবানে বিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, পিসি, ভাইপোই সব, রাজ্যের মানুষগুলি কিসসু না!

যখন ‘স্পিডব্রেকার দিদি’র সঙ্গে চৌকিদার মোদীর দেখা হলো তখনও কারা যেন হাজার মাইল দূরে বাংলা থেকে ‘চোর হায়, চোর হায়’ বলে চিৎকার করছিলেন। বলুন তো তাঁরা কারা? তাঁরা কি রাজীব কুমার মামলার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন? তাঁরা সারদার ভুক্তভোগীরা নয় তো?