সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : মানুষটি কোনওদিন রাগ করতেন না, কিন্তু অনেকেই তাঁকে অকারণেই ভয় পেতেন। অনেকেই কাছে গিয়েও কথা বলতে সাহস পেতেন না। এমনও হয়েছে বিখ্যাত কোনও নায়ক বা গায়ককে তাঁর ফিল্মে কাজ করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই কথা বলতে গিয়ে বেমালুম বাক্যহারা হয়েছেন। কিছুটা তাঁর গাম্ভীর্য আর অনেকখানি সম্মানে। তিনি সত্যজিৎ রায়। ঠিক এমনই অবস্থা হয়েছিল বিখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী অমর পালেরও।

ঘটনা প্রসঙ্গ ‘কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়’ গান। সত্যজিৎ রায়ের বেশিরভাগ ছবির গানে গলা দেওয়া অনুপ ঘোষাল অমর পালকে নিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে। তখন তিনি হীরক রাকার দেশের ওই বিখ্যাত গানটির জন্য একজন ভালো লোক শিল্পীর খোঁজ করছিলেন। অনেকটা রিক্রুটারের কাজ করেছিলেন অনুপ ঘোষাল। সত্যজিত রায় নিজেই দরজা খুলে অমর পালকে ভিতরে আসতে বলেন। তারপর খানিক চা খাওয়া।

তারপরে অমরবাবুকে তিনি বলেন, “একটা গান শুনবো”। তিনি একটা ভাটিয়ালি গান “এ ভব সাগরে ক্যামনে দিব পাড়ি” গেয়ে শোনান। গান গাওয়ার পর ভিতরে ভিতরে টেনশন চলছিল অমর পালের। অত বড় পরিচালক, কি বলবেন! অথচ তিনিও তখন যথেষ্ট নাম ডাক করে ফেলেছেন, তবু বুকে দুরু দুরু ভাব। গান শুনে সত্যজিৎ রায় বললেন, “বাঃ, আমার ছবিতে একটি গান আছে, সেটা আপনি গাইবেন। গান তৈরি হলে আপনাকে খবর দেব”।

এর কিছুদিন পরে ফের ডাক পরে অমর পালের। স্বরলিপি সুর সবই তখন তৈরি। পিয়ানোতে নিজে বাজিয়ে গানটি গাইলেন। একবার নয় বার তিন চারেক। তারপরে অমর পালকে বলেছিলেন, “ঠিক আছে?” বিখ্যাত শিল্পী হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না সত্যজিৎ রায়ের গানের কি বিচার করবেন তিনি! অমর পাল বলেছিলেন , “আমি তখন ভাবছিলাম যদি যদি বলি হ্যাঁ, ঠিক আছে। তবে যদি তখনই একবার গাইতে বলেন! যদি ওঁর মনের মতো না হয়!”

এসব নানা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছিল। শেষে অনেক স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ভেবে বলেছিলেন, “আমি একদিন এসে আপনাকে গানটা শুনিয়ে যাব”। ব্যারিটোন স্বরে উত্তর এসেছিল। সত্যজিৎ বলেছিলেন, “কোনও দরকার হবে না”। এতে আরও ফাঁপরে পরে গিয়েছিলেন। পরে ধন্ধ কেটে গিয়েছিল। পরে বাড়িতে গিয়েই গানের ট্রায়াল দিয়ে এসেছিলেন। রায়বাবু মন দিয়ে শুনলেন। এবার উত্তর এল, “ঠিক আছে”। ব্যাস এইটুকুই।

এরপর সোজা রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়। রেকর্ডিংয়ের আগে তিনবার রিহার্সাল হয়েছিল। তারপর একবার মনিটর। দ্বিতীয়বারে টেক। গানটা গাওয়া শেষ হতেই, ফের সেই ব্যারিটোন কন্ঠ। কোনও ভূয়সী বা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা নয়। রায় অমর পালকে বললেন শুধু, “ও কে”। ফের ঘেঁটে ‘ঘ’ বিখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী। শেষে সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায় ব্যপারটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি এসে অমর পালকে বলেছিলেন, “খুব ভালো হয়েছে”। প্রায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন শিল্পী। পরে সত্যজিৎ রায় তাঁকে ডেকে নেন। উত্তর সেই একই ধরনের , “ও.কে, ঠিক আছে”।

অমর পালের কথায় , “ওঁর সামনে আমি বেশি কথা বলতাম না । প্রথম দিন গিয়ে তো বোবার মতো বসেছিলাম”।