কলকাতাঃ  ‘ঘরের ছেলে ঘরে ফিরল’। কিন্তু তিনি তো ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’-এর কথা বলেন। তাই শান্তিনিকেতনে জনসভায় এসেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণে চলে এল আফগানিস্তান থেকে দেশে ফিরে আসা জুডিথ ডিসুজা’র কথা। অনেক আশঙ্কার পর যিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে পেরেছিলেন দেশের মাটিতে। হঠাৎ জুডিথ ডিসুজা’র কথা স্মরণ যেন তৃণমূল এবং কংগ্রেসকে বিশেষভাবে খোঁচা দিয়েছেন নমো।

২০১৩ সাল , তালিবানিদের হাতে খুন হয়েছিলেন বিখ্যাত লেখিকা সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূল কংগ্রেস অনেকবার মৃত লেখিকার দেহ ফিরিয়ে আনার কথা বললেও, তা সম্ভব হয়নি। লেখিকার শেষ কৃত্য সম্পন্ন হয়েছিল সেই দেশেই। ২০১৩ সাল অর্থাৎ সেই সময়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় কংগ্রেস। কাট টু ২০১৬, ২৫ জুলাই দেড় মাস উধাও থাকার পরে অবশেষে বাড়িতে পা রাখলেন কাবুলে অপহৃত কলকাতার মেয়ে জুডিথ ডিসুজা। কেন্দ্রে তখন এসে গিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার।

 

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন , কংগ্রেস জমানায় বিখ্যাত লেখিকার মৃত দেহটুকুও ফিরিয়ে আনার ব্যর্থতা এবং তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি বিফলে যাওয়াকে টার্গেট করেই শান্তিনিকেতনে জনসভায় বিজেপির সফলতার কথা মনে করিয়ে দেন নরেন্দ্র মোদী। তার সাফল্য বানীর তাস ছিলেন জুডিথ ডিসুজা।

এদিনের জনসভায় নরেন্দ্র মোদী বলেন , “বাংলার মেয়ে আফগানিস্তানে অপহৃত হয়েছিল। আমরা কূটনৈতিকস্তরে কথা বলে তাকে ফিরিয়ে এনেছি।” ২০১৬-র জুন মাসে রাতে পার্টি থেকে ফেরার পথে অপহরণ করা হয়েছিল জুডিথ ডিসুজাকে। সেই সময় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন নিরাপত্তাকর্মী ও ড্রাইভার। তাঁদের অপহরণ করে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা। জুডিথ ছিলেন সমাজকর্মী। সূত্রের খবর ছিল ঠিক সেই কারনেই মৌলবাদীদের অপহরণের তালিকায় উপরের সারিতে ছিলেন তিনি। তাঁর খোঁজ পেতে আফগান প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল সুষমা স্বরাজের দফতর। শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই দেড় মাস উধাও থাকার পরে অবশেষে বাড়িতে পা রাখেন কাবুলে অপহৃত কলকাতার মেয়ে জুডিথ ডিসুজা। দেড় মাসে ধরে অপহরণকারীদের কাছে বন্দি ছিলেন জুডিথ। অপহরণকারীদের ডেরায় খাওয়াদাওয়া , জল প্রায় কিছুই দেওয়া হতো না বলে জানিয়েছিলেন জুডিথ। তার উপর সারাক্ষণ একটা ভয় কাজ করত। সেই ভয় ছিল মৃত্যু ভয়।

একইরকমভাবে লেখিকা সুস্মিতাও তালিবানিদের বর্বরতার বিরুদ্ধে কাজ করতেন স্বেচ্ছাসেবক হয়ে। আফগানিস্তানে তালিবান শাসন শুরু হলে, সুস্মিতা সে দেশে মৌলবাদী শক্তির বিকাশ লক্ষ্য করেছিলেন। তালিবান শাসনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি বন্ধ করার আদেশ জারির পর ১৯৯৫ সালের মে মাসে তালিবানরা তাঁর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে প্রচন্ড মারধোর করে। এরপর তিনি দু’বার পালানোর চেষ্টা করে ধরা পড়লে তাঁকে ঘরবন্দী করে রাখা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে এক ফতোয়ায় ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে জুলাই তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু গ্রামের প্রধানের সহায়তায় তিনি তিনজন তালিবানকে একে-৪৭ রাইফেলের সাহায্যে গুলি করে গ্রাম থেকে পালাতে সফল হন।

তিনি সেখান থেকে কাবুল পৌঁছে ১২ই আগষ্ট বিমানে কলকাতা চলে আসতে সফল হন। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতে বাস করেন ও বহু বই লেখেন। ওই বছরেই তিনি আফগানিস্তান ফেরেন এবং পাক্তিকা প্রদেশে স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে ফের কাজ শুরু করেছিলেন। সেখানকার মহিলাদের জীবনযাত্রা নিয়ে তিনি একটি চলচ্চিত্র বানানো শুরু করেছিলেন। আফগান পুলিশের সেই সময় জানিয়েছিল সামাজিক কাজকর্ম ও তাঁর লিখিত বইয়ের জন্যই তাঁকে খুন করা হয়েছিল। প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে এক তালিবানপন্থী জঙ্গীদল এই ঘটনার দায় স্বীকার করে নিয়েছিল।