সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : কথিত রয়েছে রোম যখন দাউদাউ করে জ্বলছিল নিরো নাকি ঘরে বসে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। এ নিয়ে অনেক বিতর্কও রয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেন সেরকমই। নির্বাচনের উত্তাপে পুড়ছে সারা ভারত তখন নরেন্দ্র মোদী রইলেন নীরব। ধ্যানে মগ্ন। অপরদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিনি বাজালেন কি-বোর্ড। শান্তভাবে। সবাই যখন হইচই জুড়ে দিয়েছে তখন এই দুই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শান্ত।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তখন শেষ দফার ভোটগ্রহণ পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল, তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন কেদার বদ্রীর পথে। যাত্রার পথে জানিয়েছিলেন , ‘নির্বাচন কমিশন সফরের অনুমতি দিয়েছিল বলেই দু’দিন এখানে বিশ্রাম নিতে পারলাম। এই গুহায় ফোন বা ইন্টারনেটের কোনও সংযোগ নেই, ফলে ২৪ ঘণ্টা বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। শুধু গুহার ছোট্ট জানলাটা দিয়ে কেদারনাথ মন্দিরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।’

গত শনিবার লাল কার্পেটে মোড়া রাস্তায় কেদারনাথে শিবের পুজো দেওয়ার পর দুপুর দু’টো নাগাদ গুহায় ঢোকেন প্রধানমন্ত্রী। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর ধ্যান। রবিবার গুহা থেকে বেরিয়ে ভোটারদের উদ্দেশে টুইট করেন, ‘আপনার একটা ভোট আসন্ন বছরগুলিতে ভারতের উন্নয়নের দিশা স্থির করবে। আশা করি প্রথম ভোটাররাও উৎসাহ সহকারে ভোট দেবেন।’ কিন্তু ভোটের কথা বলতে শুধু এটুকুই।’ শেষ দফা ভোটের আগে মোদীর ওই কেদার-বদ্রী সফর নিয়ে বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছিল। কিন্তু তাতে মোদীর বিশেষ হেলদোল ছিল না। ১৫ ঘণ্টার ধ্যানপর্বে কী চেয়েছিলেন তিনি ? মোদীর জবাব ছিল, ‘আমি কিছুই চাইনি। ঈশ্বর আমাদের শুধু দিতে চান, তাই কোনও কিছু চাওয়ায় আমার বিশ্বাস নেই। আমি শুধু চাই, বাবা কেদারনাথ তাঁর আশীর্বাদ সমগ্র মনুষ্যসমাজের উপর বর্ষণ করুন।’ অনেকটা শাহজাহান রিজেন্সির কিচ্ছু চাইনি আমি , ‘আজীবন ভালোবাসা ছাড়া’-গানের কথার মতো ছিল তাঁর বক্তব্য।

আশা যাক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, নির্বাচনের ফলাফলের ঠিক আগের রাত। এক্সিট পোলের ফল চাপ বাড়িয়েছে অনেকে কট্টর তৃণমূল সমর্থকদের। এরপর তিনি অভিযোগ করেছিলেন, এসবই বিজেপির ষড়যন্ত্র, এক্সিট পোলের মাধ্যমে প্রভাবিত করে বিরোধীদের জোট ভঙ্গ করার চেষ্টা করছে তারা। ব্যাস, এইটুকুই। কাট টু ২২ মে ২০১৯, তৃণমূল সুপ্রিমোকে দেখা গেল কি-বোর্ড হাতে। তিনি একটি ফেসবুকে পোস্ট করেন , তাতে দেখা যায় নিজের বাড়িতে সিন্থেসাইজারে ‘প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে’ বাজাচ্ছেন। টুইটারে একটি নতুন কবিতাও পোস্ট করেন তিনি। রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা, তাঁর ফুরফুরে বডি ল্যাঙ্গোয়েজের মাধ্যমে তৃণমূলনেত্রী দলীয় কর্মীদের কাছে এ বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছেন, যাতে তাঁরা ফলপ্রকাশের আগের দিন নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। সেই সঙ্গে তিনি নেতা-কর্মীদের এ-ও বার্তা দিয়েছেন যে, সতর্ক থেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। গণনা সম্পূর্ণ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত কাউন্টিং এজেন্টরা যাতে কাউন্টিং টেবিল না-ছাড়েন, সেই বার্তাও ফের পৌঁছে দেওয়া হয়েছে দলের অন্দরে।

সবমিলিয়ে দুই হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগে যেন রোমের সম্রাটের রূপে। দেশ চিন্তায় মগ্ন, তাঁরা শান্ত। আবার অনেকেরই ধারনা নেতা নেত্রীরা দেশের জন্য কম ভাবেন নিজের এবং দলের জন্য বেশি। সেদিক থেকেই নিরোর সেই কথিত রূপের সঙ্গে কোথাও যেন এই রূপেরও মিল পাওয়া যাচ্ছে।

টাইম মেশিনে চড়ে অনেকটা পিছনে যাওয়া যাক। ৬৪ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ, ১৯ জুলাই অগ্নিকাণ্ডে (লাতিন: Magnum Incendium Romae) রোম নগরীর অধিকাংশ এলাকা আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বলা হয় ঠিক সেই সময় সম্রাট নিরো বেহালা বাজাচ্ছিলেন। পরবর্তীকালে এই কথা গুজব হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গিয়েছে, তখনও বেহালা বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কার ঘটেনি। কিন্তু তিনি প্রাচীন গ্রীসের উদ্ভাবিত লির যন্ত্র বাজাতে পারতেন। টাসিটাসের মতে, এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য নিরো খ্রিস্টানদেরকে দায়ী করেছিলেন। কিন্তু অনেক রোমান মনে করেন যে, নিরো স্বয়ং ডোমাস অরেয়া স্বর্ণ ভবন নির্মাণে আগুন লাগানোর আদেশ দিয়েছিলেন।