সাক্রামেন্টো, ক্যালিফোর্নিয়া: ডোনাট৷ খেতে সুস্বাদু৷ জিভে জল আনা ডোনাট কেনার তাই ভিড়ও থাকে ক্রেতাদের৷ ডোনাটের দোকানের নাম ডোনাট সিটি৷ সেই দোকান তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে গেলে ডোনাট প্রেমীরা তার ইয়াম্মি স্বাদ নেবেন কী করে? তাই ভোর থেকে শুরু হয়ে যাচ্ছে দোকানে ভিড়৷ ঘটনাটি ক্যালিফোর্নিয়ার৷

ডোনাটের দোকানের মালিকের স্ত্রী স্টেলা অসুস্ত৷ তাই তাঁকে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে৷ দোকান বেশি দেরি করে বন্ধ করতে পারবেন না৷ এই খবর মালিকের বন্ধুরা চাউর করে দেয় এলাকায়৷ এরপরই সব ক্রেতারাই ভোর ভোর দোকানে গিয়ে ডোনাট কিনে নিয়ে ফিরছেন৷

দোকান খুলছে ভোর সারে চারটের সময়৷ দোকানে সেসময় ভর্তি থাকছে ডোনাট৷ সেই দোকান ভর্তি ডোনাট সোমবার শেষ হয়ে গিয়েছে সকাল ৭.৩০ টায়৷ মাত্র তিন ঘণ্টায় দোকান খালি৷ এমনটাই চলছে টানা এক সপ্তাহ ধরে৷ ডোনাট শহরে সিল বিচের ধারের এই দোকানের সব সুস্বাদু ডোনাট শেষ হয়ে যাচ্ছে দ্রুত৷ দোকান বন্ধ হওয়ার সময় দুপুর দুটো৷ কিন্তু দোকানের মালিক স্ত্রীর দেখাশোনা করতে বেশ আগেই ঘরে ফিরে যেতে পারছেন৷

ক্রেতারা বলছেন ওই দোকানের ডোনাটের স্বাদ অসাধারণ৷ কিন্তু তাঁরা যেহেতু লাইনে দাঁড়িয়ে সময় ব্যায় করে কিনতে যেতে পারছেন না তাই টানা এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের ডোনাট খাওয়া হয়নি৷ যদিও এটা শুরু হয়েছে সম্প্রতি৷ গত ২৮ বছর ধরে স্বামী স্ত্রী স্টেলা ও জন চ্যান কাউন্টারে বসেন ও ক্রেতাদের তাজা ডোনাট পরিবেশন করেন৷ কিন্তু কয়েকদিন ধরেই ক্রেতারা স্টেলাকে দেখতে পাচ্ছিলেন না৷ তখন তাঁরা বুঝতে পারলেন কিছু একটা সমস্যা হয়েছে৷

ক্রেতারা জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন স্টেলা অ্যানিউরিজমে ভুগছেন ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে৷ এখন তিনি নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন৷ জনের বয়স ৬২ ও তাঁর স্ত্রী ৬৩৷ স্ত্রী কে দেখতেই তাঁকে তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে যেতে হয়৷ দুপুরে সব ডোনাট বিক্রি হয়ে গেলে দোকান পরিষ্কার করে তবেই তিনি যেতে পারেন স্ত্রী কে দেখতে৷

ডন ক্যাভিয়োলা নামের এক ক্রেতা জানান “সময় চলে যাচ্ছিল এবং আমি এই চিন্তার বাইরে বেরোতে পারছিলাম না৷ তাই আমি সিদ্ধান্ত নিই যদি বেশি মানুষ প্রতিদিন ডজন ডজন ডোনাট কেনেন তিনি তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করতে পারবেন৷ তারপর তিনি তাড়াতাড়ি স্ত্রী এর কাছে যেতে পারবেন৷”

 

এরপরই ক্যাভিয়োলা তাঁর আইডিয়া পোস্ট করেন তাঁর প্রতিবেশীদের সঙ্গে৷ এরপরই ডোনাটের ফ্যান ও প্রতিবেশীরা ভাল রকম সাড়া দেন৷ রাত থকাতে থাকতেই তাঁরা ডজন ডজন ডোনাট
ও কোয়াস্সঁ (এক ধরনের ফ্রেঞ্চ রোল) কিনতে শুরু করেন এবং সকাল ৬টার মধ্যে তাঁর দোকানের সামনে বড় লাইন পড়ে যায়৷

“আমার আজকের মত কাজ শেষ৷ আমার সব ডোনাট বিক্রি হয়ে গিয়েছে আধ ঘণ্টা আগেই৷” এক সংবাদ মাধ্যমকে ফোনে ইন্টারভিউতে জানান চ্যান৷ তখন সকাল ৮টা৷ চ্যান বলেন “প্রচুর মানুষ এসেছিলেন তাঁরা কেউ তিনটে কেউ পাঁচটা কেউ এক ডজন কিনে নিয়ে গিয়েছেন৷” তিনি জানান সোমবার ৫০ ডজন ডোনাট বিক্রি হয়েছে৷

জেনি রজার বলে এক ক্রেতা জানান প্রায় ২০ বছর ধরে তিনি ডোনাট সিটির কাস্টমার৷ তিনি জানান স্টেলা এবং চ্যান ভীষণ মিশুকে এবং হাসিখুশি দম্পতি৷ তিনি একটি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে দেখেন খবরটি৷ এবং এক ব্যক্তির উদ্যোগে ‘GoFundMe’ নামের একটি পেজ ও তৈরি করা হয়েছে যাতে চ্যানের জন্য টাকা জমানো যায়৷ কিন্তু চ্যান সেই অফার নাকচ করে দেন৷

 

রজারস জানান তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে এই খবর ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেন সকলের কাছে৷ সেখানে তাঁরা এটাই বলেন যে তাড়াতাড়ি দোকানে যান কারণ ডোনাটের দোকানে যান ও ডোনাট কিনুন৷ “আমি ভেবেছিলাম৷ দাঁড়াও, এটা আমার ডোনাটের দোকান৷ আমরা পোস্ট করতে থাকি বারবার সেটারই রিপোস্ট করতে থাকি৷ আর প্রতিদিন আমি যখন নামি দেখি লাইন ঘরের দরজা পর্যন্ত এসে গিয়েছে৷” ওই ৪৭ এর মহিলা জানান৷

রজারের পরিবার সিল বিচেই এম অ্যান্ড এম সার্ফিং স্কুলের মালিক৷ সেই স্কুল প্রতি রবিবার চার্চ কমিউনিটির জনা ডোনাট কেনে৷ এই সপ্তাহে রবিবার তিনি সকাল ৬.৩০ এ দোকানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেন কোন ডোনাটটি কম বিক্রি হচ্ছে? চ্যান তাঁকে সেই তথ্য দেন৷ তখন তিনি ডজন ডজন সেই ডোনাটটিই কেনেন৷

সোমবার সব ডোনাট বিক্রির পর চ্যান জানান এবার দোকান পরিষ্কার করে দ্রুত তিনি স্ত্রী কে দেখতে যেতে পারবেন৷ তিনি এও জানান তাঁরা কম্বোডিয়া থেকে ১৯৭০ সালে এসেছিলেন৷ ১৯৯০ সালে ডোনাট সিটি নামের ওই দোকানটি কেনেন৷ তার পর থেকেই তাঁরা খুব খুশিতে এই ছোট ব্যবসাটি সামলাচ্ছিলেন৷

কিন্তু কয়েকদিন আগেই স্টেলা অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ তখন স্টেলা কথাই বলতে পারছিলেন না৷ হাঁটা চলা করতে পারছিলেন না৷ এখন কিছু কথা তিনি বলতে পারছেন এবং উঠে বসতে পারছেন৷ স্টেলা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছেন৷ স্টেলা ও চ্যানের এই প্রয়োজনের সময়ে তাঁর পড়শি ক্রেতা ও বন্ধুরা পাশে থেকে তাঁর সমস্ত ডোনাট বিক্রি করিয়ে দিচ্ছেন৷

চ্যানকে কারো কাছে হাত পাততে হয়নি৷ দোকানের ডোনাট বিক্রি করছেন মাথা উঁচু করে৷ এবং এই ষাটোর্ধ দম্পতিকে কতটা ভালবাসেন তাঁদের পরশি ও ক্রেতারা তার প্রমাণ দিয়েছেন তাঁরাও৷ কথাতেই বলে দুঃখের সময় যে পাশে থাকে সেই আসল বন্ধু৷