সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ধর্মনিরপেক্ষ দেশ ভারত। সমস্ত উস্কানির বিরুদ্ধে সবার উপরে ভারতে একটাই ধর্ম, মানব ধর্ম। এটাই সাধারণ সমাজ ও মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করতেই ভারত তথা বাংলায় বিভিন্ন সময়ে জন্ম হয়েছে মনিষীদের। এঁদেরই অন্যতম আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। পুঁথিগত শিক্ষা যেমন তাঁকে মনীষীর আসনে বসিয়েছিল তেমনই সামাজিক ও মানবিক শিক্ষাও ছিল তাঁর আরও এক রূপ।

এমনিতে রাশভারি মানুষটির সঙ্গে সহজে কথা বলতে সাহস পেত না। কিন্তু শিক্ষাব্রতী স্যার আশুতোষকে অনেক ক্ষেত্রেই অতিক্রম করে গিয়েছিলেন ছাত্রদরদী স্যার আশুতোষ। সমাজকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল মানব ধর্মই আসল। এটাই আসল শিক্ষা আর সেই শিক্ষার মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাশভারি ব্যক্তিত্বের দরদী মন।

ভারতীয় উপমহাদেশের কিংবদন্তী ভাষাতত্ত্ববিদ ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহকে বেদ পাঠের জন্যে বিশেষ অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি। ডঃ মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ বেদ পড়তে চেয়েছিলেন। এদিকে জন্মসূত্রে মুসলমান হওয়ার জন্য সেই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও শিক্ষকই তাঁকে বেদ পড়াতে চাননি। সম্ভবত শিক্ষক হয়েও তাদের মনে ‘জাত গেল জাত গেল’ ভাবের কুসংস্কার লুকিয়ে ছিল।

এই ক্ষেত্রে সবথেকে বেশি প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকা পালন করেছিলন সে যুগের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট্য অধ্যাপক সমাধ্যায়ীই। যাবতীয় বিরুদ্ধাচারণকে উড়িয়ে দিয়ে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে অনুমতি বেদ পড়ার অনুমতি দিয়ে স্যার আশুতোষ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ইতিহাসের রচনা করেছিলেন।

পরাধীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্যার আশুতোষ বারবার ব্যক্তিজীবনে ধর্ম নিরপেক্ষতার চর্চাকে সবার উপরেই রাখতেন। একুশ শতক ফাইভ-জি’এর যুগ। ভারত ছুটছে দুরন্ত গতিতে। তারপরেও বিভিন্ন সময়ে খবরের পাতায় উঠে আসে এক ধর্মের প্রতি অন্য ধর্মের মানুষের অসহিষ্ণু মনোভাব।

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁর বিধবা কন্যা কমলার গৃহ শিক্ষকের হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন তাঁর আইন পেশার জুনিয়র ফজলুল হক কে। যিনি পরবর্তীকালে রাজনীতির জগতে স্বনামধন্য হয়েছিলেন। আবার উচিৎ শিক্ষা দিতেই তিনি ছিলেন ওস্তাদ। সাধে কি তিনি ‘বাংলার বাঘ’।

ঘটনা জানা, তবু ২৫মে স্যার আশুতোষের মৃত্যু দিবসে অমানবতাবোধের শিক্ষা কেমন হওয়া উচিৎ তা মনে করা। মধুপুর থেকে ট্রেনে একবার কলকাতায় ফিরছিলেন। প্রথম শ্রেণীর কামরায় উঠে তিনি দেখলেন একজন ইংরেজ সাহেব বসে আছেন। সাহেব তাঁর কামরায় একজন নেটিভের উপস্থিতি কিছুতেই পছন্দ করলেন না। স্যার আশুতোষ তা গ্রাহ্য না করে নিজের বার্থে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ঘুম ভাঙার পর দেখলেন তাঁর জুতো জোড়া নেই। ব্যাপারটি বুঝতে তাঁর দেরি হলো না। সাহেব কে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে হুক থেকে তার কোটটি খুলে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দিলেন। ঘুম থেকে উঠে সাহেব কোট দেখতে না পেয়ে ক্রুদ্ধভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “আমার কোট কোথায়?” স্যার আশুতোষ গম্ভীর ভাবে বললেন, “তার আগে বলুন আমার জুতো জোড়া কোথায়?” সাহেব বললেন,তোমার জুতো জোড়া বাইরে হাওয়া খেতে গেছে।আশুতোষও সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আর তোমার কোট আমার জুতো জোড়া খুঁজে আনতে গেছে”।