লকডাউন আদৌ কবে উঠবে তা স্পষ্ট নয়। যে দিনই উঠুক তারপর দেশের অর্থনৈতিক চাকা কীভাবে কোন খাতে বইবে তা বোঝা খুব শক্ত। নেতিবাচক উত্তরের খোঁজ মিলছে বেশি। বিকল্প ব্যাবস্থা কি হতে পারে? বিশেষ করে সমগ্র বাংলা ও বাঙালির আগামী কীভাবে এগোবে সেই পথের দিশা দিলেন বাংলা ও বাঙালিদের দাবী নিয়ে আন্দোলনকারী সংগঠন ‘বাংলা পক্ষে’-এর সদস্য কৌশিক মাইতি।  

কৌশিক মাইতি : করোনা মহামারী এবং লক ডাউনের কারণে বাংলা সহ গোটা ভারতে কাজ হারাচ্ছেন লাখ লাখ শ্রমিক। অন্য রাজ্য থেকে ঘরে ফিরেছে অনেক শ্রমিক, ট্রেন চললে ফিরবে আরও অনেকেই৷ মাসে মাথা পিছু ৫ কেজি রেশনের চাল না হয় পেল, কিন্তু তারপর? তাদের পেট চলবে কিভাবে? বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা কি? কাজই বা কোথায় পাবে?

 

এই লক ডাউন অনেক সমস্যা বাড়িয়েছে। মানুষের মৃত্যু, শ্রমিকের কাজ হারানো- এত খারাপ দৃশ্যের মাঝেও আমাদের কাছে কিছু সুযোগ এনে দিয়েছে এই করোনা মহামারী। নতুন করে ভাবতে হবে অনেক কিছুই। বাংলা থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ শ্রমিক অন্য রাজ্যে কাজ করতে যায়। অন্যদিকে অন্য রাজ্য মানে বিহার, ইউপি, ঝাড়খন্ড থেকে লাখ লাখ মানুষ বাংলায় আসে কাজের সন্ধানে। বাংলার শ্রমিকরা বাংলায় ফিরছে। কিন্তু কয়েকটা জিনিস প্রথমে জেনে নেওয়া যাক। বাংলা থেকে শ্রমিকরা মূলত কোন কোন কাজের জন্য অন্য রাজ্যে যায়? সোনার কাজ, রাজমিস্ত্রীর কাজ এবং জরি বা কাপড়ের কাজ ইত্যাদি। এগুলোতে বাঙালির দক্ষতা সর্বজনবিদিত। মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, দিল্লী, চেন্নাই, কেরালা, সুরাট, রাজস্থানে কাজ করতে যায় বাঙালি শ্রমিকরা। বিভিন্ন রাজ্যে সোনার ব্যবসা, কন্সট্রাকশন ব্যবসা, কাপড়ের জরির ব্যবসা টিকে আছে বাঙালি শ্রমিকদের উপর নির্ভর করেই।

 

এক্ষেত্রে আমাদের রাজ্য কি করতে পারে? দক্ষ সোনার কারিগরদের একটা বড় অংশ বাংলায় ফিরছে। তাদের কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বাড়াতেই পারে বাংলা। দরকার সরকারি উদ্যোগ, এগিয়ে আসতে হবে বাংলার সোনা ব্যবসায়ীদেরও৷ এবং অন্যান্য রাজ্য গুলো যেহেতু বাংলার শ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল, তাদের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে রাজ্য বাংলার শ্রমিকদের পাঠাতে পারে। ফলে সুবিধা হবে শ্রমিকদের, প্রাপ্য মর্যাদা ও মজুরি পাবে তারা।

 

মালদাহ ও মুর্শিদাবাদের রাজমিস্ত্রীরা ভারতের কন্সট্রাকশন ব্যবসার অন্যতম স্তম্ভ। তাই এক্ষেত্রে বাংলার সরকার প্রতিটা রাজ্যের সাথে কথা বলে বাংলার রাজমিস্ত্রীদের কাজ, থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করতে পারে। কারণ বাংলার শ্রমিক ছাড়া নির্মাণ শিল্প ভারতে কি আদৌ চলতে পারে?

 

অন্যদিকে মুম্বই ও গুজরাটের কাপড়ের মিলে কাজ করা বহু দক্ষ বাঙালি শ্রমিকরা ফিরেছে বাংলায়। তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এব্যাপারে বস্ত্র শিল্পে ব্যাপক উন্নতি করতে পারে বাংলা। নদীয়ার শান্তিপুরে পাওয়ার লুম আছে। বাংলার সব সরকারি অর্ডার, এমনকি ব্যবসার সব জামা কাপড়ও শান্তিপুর, রানাঘাট, ধনেখালি তে টেক্সটাইল হাব বানালে কয়েক লক্ষ বাঙালির কর্ম সংস্থান হবে। দক্ষ বাঙালি শ্রমিক এবং টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞের অভাব হবে না বাংলায়।

মুর্শিদাবাদ ও মালদাহে রেশম শিল্পে ব্যাপক সম্ভবনা থাকলেও বাংলা কখনও খুব একটা উন্নতি করেনি৷ রেশন চাষ হলেও তা বাইরে চলে যায় কাপড় তৈরির জন্য, বাংলাতেই এই ব্যবস্থা করা যায়। মাছ, মাংস ও ডিমের ব্যাপক চাহিদা বাংলায়। বাংলা কোনওটাতেই স্বনির্ভর নয়। এটা বাংলার বড় দুর্বলতা। এটা সহজেই পরিকল্পনা করে পূরণ করা যায়। এর জন্য সুসংহত পদ্ধতিতে মাছ চাষ, পশু খামার তৈরি, পোলট্রি ব্যবসায় বিশেষ নজর দিতে হবে বাঙালিকে ও রাজ্য সরকারকে। বাংলায় মুর্শিদাবাদ ও মালদাহে আমের নানা সামগ্রী তৈরির জন্য খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ব্যাপক নজর দিতে হবে। বাংলায় ব্যাপক আলু, ধান, বাদাম চাষ হয়- এগুলোর পুরো ব্যবসা বাঙালির হাতে থাকলে প্রচুর বাঙালির কর্ম সংস্থান হবে।

 

লকডাউন পরবর্তীতে বাংলাকে বাঁচাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে, এই শিল্পে ব্যাপক কর্ম সংস্থান হয়, উন্নত হয় স্থানীয় অর্থনীতিও। বড় শিল্পে এখন কর্ম সংস্থান খুব একটা বেশিও হয় না এখন, লক ডাউন পরবর্তীতে বড় শিল্পে বিনিয়োগও সেভাবে হবে না। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুযোগ বাড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ সহজলভ্য করলে নতুন দিগন্ত খুলে যাবে এই বাংলায়। রাজ্যের সমবায়, কো-অপেরটিভ ব্যাংক এবং মাইক্রো ফিনান্স সংস্থা গুলোকে আরও জোরদার করতে হবে।

 

বাংলায় যেসব জায়গায় ফুটপাতে ব্যাপক ভাবে ব্যবসা হয়, প্রায় কোনোটাই বাঙালির দখলে নেই। সেটা বড়বাজার, মেটিয়াবুরুজ, নিউ মার্কেট, আসানসোল, শিলিগুড়ি সর্বত্রই৷ অন্য রাজ্য থেকে ফেরা শ্রমিকদের বিকল্প কর্ম সংস্থান ও আয়ের ব্যবস্থা করতে বাংলার কমপক্ষে ৯০% ফুটপাতের দখল বাংলার ভূমি সন্তানদের হাতে চাই।

 

গোটা ভারতের প্রায় ২৫ শতাংশ কয়লাখনি এই বাংলায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অধিকাংশই বিহার, ইউপি, ঝাড়খন্ডের শ্রমিক ও কর্মচারী। বাংলায় যেসব শিল্প তালুক আছে সব জায়গাতেই বাঙালি কর্মী নগন্য, অনেক কোম্পানী পরিকল্পনা করে বাঙালি নেয় না। হাওড়া শিল্পাঞ্চল থেকে খড়্গপুর কিমবা আসানসোল শিল্পাঞ্চল সব জায়গাতেই বাঙালি বঞ্চিত। এই সমস্ত এলাকায় কমপক্ষে ৮৬% বাঙালিকে কাজ দিতে হবে।

 

অন্যান্য সব রাজ্য ভূমিপুত্র সংরক্ষণের পথে এগিয়েছে। কিছু রাজ্যে তা আইনে পরিণত হয়েছে। লক ডাউন পরবর্তীতে প্রতিটা রাজ্যই নিজের শ্রমিক ও কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেবে সর্বক্ষেত্রে৷ বাংলাকেও নতুন করে ভাবনা চিন্তা করতে হবে। এটাই সুযোগ। আগামী তিন বছরের মধ্যে বীরভূমের দেউচা পাঁচামিতে এশিয়ার বৃহত্তম কয়লাখনিতে কয়লা উত্তোলন শুরু হবে। কমপক্ষে ৩-৫ লাখ মানুষের কর্ম সংস্থান হবে। এক্ষেত্রে চাকরি, ঠিকা কাজ কিমবা টেন্ডার সবই বাংলার ভূমিপুত্রদের দিতে হবে। কলকাতায় বানতলায় লেদার কমপ্লেক্স হচ্ছে, উত্তর প্রদেশ থেকে এই ব্যবসা বাংলায় শিফট হচ্ছে, এর সুফল তুলতে হবে বাঙালি ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের। সরকারেরও সদর্থক ভূমিকা চাই। জেলা শহর, মফঃস্বল ও কলকাতায় অটো, টোটো, ট্যাক্সি, ক্যাব সব ক্ষেত্রেই ৯০% ভূমিপুত্র চাই। এটাই আগামীর একমাত্র পথ।

 

যে যে ক্ষেত্র গুলোয় আমরা জোর দিলে বাংলা স্বনির্ভর হবে, ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে, বাংলার মানুষের ব্যাপক আয়ের ক্ষেত্রে তৈরি হবে তা বিস্তারিত বললাম। এবার দেখার রাজ্য সরকার ভূমিপুত্র সংরক্ষণ বা এই সমস্ত শিল্পের ক্ষেত্রে ও কর্ম সংস্থানের জন্য কি কি ব্যবস্থা নেয় তা সময় বলবে। সজাগ থাকতে হবে বাঙালিকে। যদি সরকার এই পথে না এগোয় বাঙালির সামনে কালো আঁধার নামবে।

 

করোনা অনেক ক্ষতি করেছে, কিন্তু বাঙালির সামনে অনেক দরজা খুলে দিয়েছে। আমরা সদব্যবহার করতে পারলে ফিরে তাকাতে হবে না।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ