দেবময় ঘোষ: লোকসভা নির্বাচনের মুখেই রাজ্যের ভোটারদের জাতীয় নাগরিকপঞ্জীকরণ বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) নিয়ে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস বিভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে৷ লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়ে গিয়েছে রাজ্যে ১৮টি আসন পেয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে বিজেপি৷ লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ বলে এসেছেন – পশ্চিমবঙ্গে সব থেকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু এসআরসি৷ কারণ, ২০২১ সালে বিজেপি ক্ষমতায় এলে অসমের মতো এরাজ্যেও এনআরসি জারি করা হবে৷ অসমে এনআরসি নিয়ে নতুন করে গোলমাল বেধেছে, কারণ প্রায় লক্ষাধিক মানুষের নাম ওই তালিকায় নেই৷

এনআরসি নিয়ে বিজেপির যা বক্তব্য, তা পরিষ্কার করে দিয়ে গিয়েছেন অমিত শাহ৷ তিনি বলে গিয়েছেন, ভারত ভাগ হয়েছিল ধর্মীয় কারণেই৷ তাই প্রতিবেশি দেশ থেকে আসা মানুষদের অনুপ্রবেশকারী এবং শরণার্থী – এই দুই ভাগে ভাগ করতে চায় বিজেপি৷ সেই সঙ্গেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন অমিত৷ নাগরিকত্ব বিল নিয়ে সংসদে তার অবস্থান কী হবে তা জানতে চেয়েছিলেন অমিত৷ অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এনআরসি ইস্যুটির বিরোধিতা করছেন৷ তৃণমূল কংগ্রেসের বক্তব্য, এনআরসি-এর মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের একঘরে করার চেষ্টা চলছে৷ সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিলের মাধ্যমে দেশের নাগরিকদের বিদেশী বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে৷ এনআরসি বাংলা বিরোধী৷

একটি বিষয় শুরু থেকেই বুঝে নিতে হবে যে, এনআরসি হল একটি সরকারি পদ্ধতি৷ কিন্তু সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব বিল একটি আইনি প্রক্রিয়া৷ এই বিল আইন হিসাবে পাশ এখনও হয়নি৷ মোদী সরকার এই বিলকে আইন বানিয়েই দেশ থেকে অনুপ্রবেশকারিদের তাড়াতে চাইছে৷ অর্থাৎ এনআরসি হল চিহ্নিতকরণ৷ নাগরিকত্ব বিল, যা পরবর্তীকালে আইন হিসাবে আসতে চলেছে, তা হল একটি আইনি প্রক্রিয়া৷

কী আছে এই নাগরিকত্ব বিলে? প্রথমেই বলে রাখা ভালো ১৯৫৫ সালে পাশ হওয়া নাগরিকত্ব বিলের সঙ্গে সংশোধিত বিলের বিশেষ তফাত কিছুই নেই৷ বিলে যা আছে, তা ব্যাখ্যা করলে বলতে হবে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তান থেকে আসা মুসলমানরা যেমন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, অন্যদিকে ওই তিন দেশ থেকে আসা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি, শিখ বা খ্রিস্টানদের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা হলেন শরণার্থী৷

বিলে রয়েছে, ভারতের সরকার, প্রতিবেশি দেশ থেকে আসা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেবে৷ কারণ, তাঁরা বিপদের মুখে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন৷ অন্যদিকে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানো হবে, কারণ সীমান্তের ওপার থেকে রোজগার বা বাসস্থান খুঁজে পেতে, কিংবা কোনও অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁরা এদেশে এসেছে৷ তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সংখ্যালঘুরা, যারা গত একবছর ভারতে রয়েছেন বা শেষ ৬ বছর ধরেই এই দেশে রয়েছেন, তারাই নাগরিকত্ব আইনের (বিল আইন হিসেবে পাশ হয়ে যাওয়ার পর) আওতায় নাগরিক হতে পারবেন৷ অন্যদিকে, ওভারসিজ সিটিজেন কার্ডহোল্ডারা (ওসিসি) কোনও অনৈতিক কাজ করলে তাঁদের নথীভুক্তিকরণ বাতিল হতে পারে৷

অসম চুক্তি সাক্ষর হয়ে গিয়েছিল ১৯৮৫ সালে। কিন্তু তা কার্যকর করতে প্রায় ৩৩ বছর লেগে গিয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, বৈধ ভারতীয় নাগরিক হতে গেলে ১৯৭১ সালের ২৪ জানুয়ারীর আগে ভারতে আসতে হবে। দিতে হবে তার প্রমাণ। এই সব প্রমাণ না দিতে পারার কারণে অসমে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম এনআরসি-তে ওঠেনি প্রথম দফায়৷ দ্বিতীয় দফাতেও লক্ষাধিক মানুষের নাম নেই৷ সেক্ষেত্রে মোদী সরকারের সিটিজেনশিপ (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল বা নাগরিকত্ব বিল রয়েছে৷ অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে এনআরসি-তে যাদের নাম ওঠেনি, তারা নাগরিকত্ব পাবেন৷ কিন্তু বিজেপি বিরোধীরা বলছেন, শুধুই হিন্দুরা পাবেন৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নেত্রীরা বলছেন, তাও পাবেন না৷ ৬ বছরের জন্য বিজেপি করে দেওয়া হবে৷ তারপর নাগরিকত্ব দেবে , না দেবেই না – তা মোদী সরকারের মর্জি৷

এনআরসি নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন ঘোরাফেরা করছে৷ অনেকেই জানতে চাইছেন,

প্রশ্ন ১. এনআরসি-এর ফলে বাংলাদেশ থেকে চলে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুদের পশ্চিমবঙ্গ এবং অসম থেকে বিতাড়িত হতে হবে?
উত্তর:- না৷ ২০১৪ সালে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল উদ্বাস্তু হিন্দুদের আশ্রয়স্থল ভারত এবং ক্ষমতায় এসে তিনি সে ব্যবস্থাই করবেন৷ কথামতো কাজও করেছেন তিনি৷ পাসপোর্ট আইন, বিদেশি আইন বা ফরেনার্স অ্যাক্ট-এর সংশোধন করা হয়েছে৷ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ – এর মধ্যে যারা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই ভারতে এসেছেন তারা এই দেশে আইনি বসবাসের অধিকারি হয়েছেন৷

২. বাংলাদেশী মুসলমানরা ভারতে কেন উদ্বাস্তু স্বীকৃতি পাবেন না?
উত্তর:- মোদী সরকারের বক্তব্য, রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা জানতে হবে৷ বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র৷ সেখানকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরারা ধর্মীয় কারণে অত্যাচারিত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে৷ রাষ্ট্রসঙ্ঘে উদ্বাস্তুর সংজ্ঞা অনুযায়ী তাঁদের উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় দেওয়াটাই আইনসঙ্গত৷ কারণ, উদ্বাস্তুর সংজ্ঞায় বলা রয়েছে, ‘‘যে ব্যক্তি জাতি, ধর্ম, নাগরিকত্ব, সামাজিক বা ধর্মীয় সংস্থার জন্য অত্যাচারিত হচ্ছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় দেশ ছেড়েছেন তাঁরাই উদ্বাস্তু৷ সেক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক কারণে চলে আসা কাউকে রাষ্ট্রসংঘের সংজ্ঞায় উদ্বাস্তু গণ্য করা হয় না৷ কেবলমাত্র গরীব বলেই অন্য দেশে গিয়ে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা এবং রোজগার করার অধিকার জন্মায় না৷

৩. অসমের এনআরসি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এত হৈ-চৈ কেন?
উত্তর:- এখানে মূলত দুটি কারণ রয়েছে৷

এক, বৈধ প্রমাণপত্র থাকা সত্ত্বেও অনেক বাংলা ভাষাভাষীর নাম এখনও তালিকায় ওঠেনি৷ এজন্য আবেদন করার সময় বাড়ানো হয়েছে৷ বিজেপি দাবি করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এনআরসি-এর বিষয়ে কোনও সহযোগিতা করছে না৷ অসম থেকে অন্যান্য রাজ্যে নামের নথি পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছিল৷ অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ ওই নথি পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে৷ এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে অসমে বসবাস করতে যাওয়া ১ লক্ষ নাম এখনও তালিকায় ওঠেনি৷

দুই, বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ তৈরি হবার কয়েক বছরের মধ্যেই আবার ইসলামি অত্যাচার এবং বৈষম্য শুরু হয়৷ তফশিলী জাতির হিন্দু সম্প্রদায়, যাঁরা সাহস করে স্বাধীন বাংলাদেশে থেকে গিয়েছিলেন, তাঁরাও অকথ্য অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন৷ যে বাংলাদেশে এক সময় হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৮ শতাংশ, তা এখন কমে হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ৷ পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে বেআইনি ভাবে মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা পশ্চিমবঙ্গে জনবিন্যাসের বিপর্যয় ঘটিয়েছে৷ ১৯৫১ সালে ১৯ শতাংশ মুসলমান ছিল পশ্চিমবঙ্গে৷ বর্তমানে সংখ্যাটি বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ৷

রাজ্য বিজেপির বিস্ফোরক অভিযোগ, এই বিষয়ে রাজ্যে সিপিএম, বামদলগুলি, কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস নীরব৷ কারণ, কারণ অনুপ্রবেশকারীরাই এই দলগুলির শক্তি৷ বাংলার অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী এই ইস্যুতে নীরব৷ উদ্বাস্তুদের বিষয়ে বেশি বললে, বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর ইসলামিক অত্যাচার প্রকাশিত হবে৷ বুদ্ধিজীবীরাও তা চাননা৷ বাংলাদেশ গঠনের পর এবং ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর হাজারে হাজারে বাংলাদেশী মুসলমানরা রাজ্যে ঢুকেছে৷ কেউ ঠেকায় নি৷ সিপিএমের জন্য নতুন ভোটব্যাংক তৈরি হয়েছে৷ এনআরসি প্রয়োগের প্রয়োজন এই কারণেই৷

৪. ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গে কেন এনআরসি চাইছে? কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার বলছেন সারা দেশেই এনআরসি প্রয়োজন৷ পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি-এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে?

উত্তর:- ১৯৯০ সালের ৬ মে, দেশের কমিউনিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত (সিপিআই দলের) লোকসভায় বলেছিলেন, ভারতে ১ কোটি বাংলাদেশী আছে৷ ১১ অক্টোবর ১৯৯২ সালে গণশক্তি পত্রিকায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু লিখেছিলেন, ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বিএসএফ ২ লক্ষ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন বাংলাদেশীকে তাড়িয়ে দিয়েছে৷ এরপর, ১৪ জুলাই ২০০৪ সালে কংগ্রেসের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ জয়সোয়াল লোকসভায় জানান, ভারতে মোট ১কোটি ২০ লক্ষ ৫৩ হাজার ৯৫০জন বাংলাদেশী রয়েছে৷

বিজেপির দাবি, আবার, ২০০৫ সালে লোকসভাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনুপ্রবেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে লোকসভায় অগ্নিমূর্তি ধারণ করেন৷ সুতরাং, অনুপ্রবেশ যে ভয়ানক সমস্যা তা জ্যোতি বসু থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সবাই জানতেন৷ জ্যোতি বসুরা বাংলাদেশি মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে ভোটের খেলা খেলেছেন৷ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় ইসলামীয় পরম্পরা নিয়ে এসেছেন ভোটব্যাংকের জন্যই৷ রাজ্যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের তাড়িয়ে যে আদর্শ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠিত হয়েছিল, তা ফিরিয়ে আনতে হবে৷

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বলছে, বিজেপি সংসদে নাগরিত্ব বিল পাশ করে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চালু করতে বদ্ধপরিকর৷ তা না হলে রাজ্য দিনে দিনে পশ্চিম বাংলাদেশ হয়ে যাবে৷ যদিও, মুসলমান আটকালেও কোনও হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান উদ্বাস্তু বিন্দুমাত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না৷ কারণ ২০১৫ সালে পাসপোর্ট ও বিদেশী আইন সংশোধন করা হয়ে গিয়েছে৷ বিজেপির নেতারা বলছেন, শুধুমাত্র বাংলাদেশি মুসলমানদের চিহ্নিত করুন৷ ভারতীয় মুসলমানদের জন্য এনআরসি নয়৷ ভারতীয় মুসলমানরা আমার-আপনার ভাই৷ আমাদের প্রিয় ভারতবাসী৷