১৯৬২ সালে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৬৭ সালে চতুর্থ সাধারণ নির্বাচনের মধ্যেকার পাঁচ বছরে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয় গোটা দেশে একের পর এক সংকটের ঝড় বয়ে গিয়েছে। এই পাঁচ বছরে বিদেশি আক্রমণ যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতে প্রতিকূল অবস্থার জেরে গোটা দেশ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত রাজ্য হওয়ায় বেশি করে এর ফল ভোগ করতে হয়েছে।

১৯৬২ সালের নির্বাচনে জিতে ডা: বিধানচন্দ্র রায় ফের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। তখন খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন মুখ্যমন্ত্রী হন। আবার দেশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিসহ অন্যান্য কারণে সিপিআই ভেঙে নতুন দল সিপিআইএম দলের জন্ম হয় ১৯৬৪ সালে।

এদিকে গোটা দেশের এমনই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয় মুদ্রার মূল্য রাশে। তখন বামদলগুলি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে প্রচার চালায়। কংগ্রেস সেই প্রচার ঠিকমতো মোকাবিলা করতে পারছিল না। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে প্রচন্ড খাদ্যাভাব জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্য শিল্পে অশান্তি চরমে, ব্যাপক চোরাচালান সবমিলিয়ে জনসাধারণের শাসক কংগ্রেসের প্রতি ক্ষোভ বাড়তে থাকে ।বিশেষত খাদ্যের দাবিতে বামেদের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নুরুল ইসলাম নামে এক কিশোরের মৃত্যুতে গোটা রাজ্যে অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সংযুক্ত ভাবে বামপন্থীরা বাংলা বন্ধের ডাক দেয়। রাজ্যে রাজনৈতিক হওয়া বামপন্থীদের অনুকূলে বইতে থাকে।

এরই মধ্যে আবার রাজ্যে শাসক কংগ্রেস দলের ভাঙ্গন দেখা দেয়। রাজ্যে প্রভাবশালী অতুল্য ঘোষ এবং মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনের গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন অজয় মুখোপাধ্যায়। তিনি তার অনুগামীদের নিয়ে দাবি করেন”আমরাই আসল কংগ্রেস”। গড়ে তুললেন বাংলা কংগ্রেস। কংগ্রেস কর্মীদের একাংশ যারা দীর্ঘদিন ধরে অতুল্য ঘোষের উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তারা যোগ দিলেন বাংলা কংগ্রেসে।

ভোটে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে থাকলেও বিরোধী  দুটি ফ্রন্টের মধ্যে আসন সমঝোতা হল না। এই দুই ফ্রন্টের মধ্যে একটা হল- সিপিএমের নেতৃত্বাধীন এসএসপি, আরএসপি, এসইউসি, আরসিপিআই, ওয়ার্কাস পার্টি এবং ফরওয়ার্ড ব্লক (মাক্সবাদী) নিয়ে গঠিত হয়েছিল সংযুক্ত বামপন্থী ফ্রন্ট (ইউএলএফ)৷ অন্যদিকে বাংলা কংগ্রেস, সিপিআই, ফরওয়ার্ড ব্লক এবং বলশেভিক পার্টি গঠন করেছিল বামপন্থী গণ ফ্রন্ট (পিইউএলএফ)৷সেই সময় মূলত সিপিআই এবং সিপিএমের মধ্যেকার বিরোধের কারণেই দুই ফ্রন্টের আসন সমঝোতা ধাক্কা খেয়েছিল৷ তাছাড়া পিএসপি, জনসংঘ , স্বতন্ত্র পার্টি এবং গোর্খা লিগ একাই লড়েছিল ভোটে৷ লোকসেবক সংঘ কোন ফ্রন্টে না থাকলেও পুরুলিয়ায় তাদের সমর্থন করেছিল দুই ফ্রন্টই৷

১৯৬৭ সালের নির্বাচনে আরামবাগ থেকে কংগ্রেস প্রার্থী গান্ধীবাদী নেতা প্রফুল্ল সেনের বিরুদ্ধে ভোটে লড়তে নামেন আর এক গান্ধীবাদী নেতা বাংলা কংগ্রেসের প্রার্থী অজয় মুখোপাধ্যায়৷ সেই ভোটে অজয় মুখোপাধ্যায় কাছে মাত্র ৮২০ ভোটে পরাজিত হল প্রফুল্ল সেন৷ ১৯৬৭ বিধানসভা নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা অবশ্য বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায়েছিল ২৮০টি । কংগ্রেস পেয়েছিল১২৭টি আসন। সিপিএম পায় ৪৪টি আসন এবং বাংলা কংগ্রেস পেয়েছিল ৩৩টি আসন।

অর্থাৎ ভোটের ফল বেরোবার পর দেখা যায় কংগ্রেস ১২৭ আসন পেয়ে একক বৃহত্তম দল তবে সংখ্যা গরিষ্ঠতা ছিল না। ফলে বিবদমান দুই বিরোধী জোটের নেতারা অনুভব করেন ওই অবস্থায় কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে তাদের একত্রে মিলে সরকার গড়া উচিত৷ কিন্তু দুই জোটের দলগুলির মধ্যে সর্বাধিক আসন পাওয়ায় সিপিএম তাঁদের নেতা জ্যোতি বসুকেই মুখ্যমন্ত্রী করার দাবি তোলে। কিন্তু তা মানতে নারাজ বাংলা কংগ্রেস নেতা অজয় মুখোপাধ্যায় বরং বয়েসের নিরীখে মুখ্যমন্ত্রী দাবি তোলেন।

সিপিএমও আশংকা করে এই টানাপোড়েনে অজয়বাবু যদি কোনও কারণে দলবল নিয়ে ফের কংগ্রেসের দিকে চলে যান তাহলে আসল লড়াইটাই ভেস্তে যাবে৷ কারণ সেবারে জনগণের রায় ছিল কংগ্রেস দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা৷ সেক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রিত্বের দাবীতে অনড় থাকলে সেই রায়কে উপেক্ষা করা হবে।তাছাড়া এই নিয়ে অযথা গোয়ারতুমি করলে অকংগ্রেসি সরকার গঠনের সুযোগ একবার হাতছাড়া হলে ভবিষ্যতে এমন সুযোগ ফের কবে আসবে বলা শক্ত । ফলে শেষ পর্যন্ত সিপিএম নেতৃত্ব অজয়বাবুকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়। সমাধান সূত্রে হিসেবে ঠিক হয় জ্যোতি বসু উপ-মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে অর্থ ও পরিবহণ দফতরের দায়িত্বে পাবেন। ১৯৬৭ সালের ২ মার্চ শপথ নেওয়ায় গড়ে উঠল ১৪ দলের যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.