পশ্চিমবঙ্গে বাম জমানায় অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র যেদিন জ্যোতি বসুর ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেছিলেন, তার পরের দিন ‘বর্তমানে’র প্রথম পাতায় প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্তর একটি লেখা বেরিয়েছিল৷ সেই লেখা বরুণ সেনগুপ্ত শেষ করেছিলেন এই ক’টি কথায়: এর পর হয়তো উনি (অশোক মিত্র) আমরা বাঙালির নামে মারণ-উচাটন যজ্ঞ শুরু করতে চান৷ ব্যস, জোঁকের মুখে নুন পড়ে গিয়েছিল৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

সাংবাদিক হিসাবে বরুণ সেনগুপ্ত অনেক দূরদর্শী ছিলেন৷ অনেক খবরও রাখতেন৷ ফলে, তাঁর হয়তো অজানা ছিল না স্বাধীনতার আগে ‘ঢাকার সুকান্ত’ বলে পরিচিত কিশোর লেখক সোমেন চন্দকে খুন করেছিল কে বা কারা৷ পরবর্তী কালে রাজনৈতিক পরিচিতি বদলালেও তারা যে অনেক কিছু করতে পারে এবং তাতে যে সামগ্রিকভাবে দেশেরই ক্ষতি হতে পারে, সেটা তিনি বুঝেছিলেন বলেই দু’-একটা কথায় তা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন৷

চিন্তার বিষয় এটাই যে, বরুণ সেনগুপ্ত আর বেঁচে নেই৷ ফলে, আমার বাংলা-আমার বাংলা করে আবার যে একটা হাহাকার উঠেছে সে সম্পর্কে দেশবাসীকে সাবধান করার মতো কাউকে এই মুহূর্তে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷ কেউ আর সাহস করে বরুণ সেনগুপ্তর মতো বলতে কিংবা লিখতে পারছে না যে, একটা সময় আমেরিকান গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি-র (সিআইএ) প্ররোচনায় দুই বাংলাকে একাকার করার প্রবল জিগির উঠেছিল৷ সেটা তখন তুলত সিপিএমওয়ালারা৷ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে আত্মঘাতী বিমান হানার পর সেই প্ররোচনায় ভাটা পড়ে৷ অতএব, দুই বাংলা এক করার গান তখনকার মতো থেমে যায়৷ বরুণ সেনগুপ্ত যেটা দেখে যাননি সেটা এই, ‘এপারেও বাংলা-ওপারেও বাংলা’র ব্যান্ড আবার বাজানো আরম্ভ হয়ে গিয়েছে৷ ব্যানারটা কেবল বদলে গিয়েছে৷

বাংলার সংস্কৃতি নিয়ে আদিখ্যেতার প্রয়োজন আগেও ছিল না, এখনও নেই৷ যাঁরা তা অনুসরণ করার তাঁরা সেটা ‘রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি করল কে, সিপিএম আবার কে’ স্লোগান তোলার আগেও করতেন, এখনও করেন৷ ঠিক একইভাবে, এখনও বাংলার মনীষীদের চিনিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের তরফ থেকে বড় বড় হোর্ডিং টাঙানোর কোনও দরকার পড়ে না৷ যারা পড়ার তারা পড়বে, যারা মনীষীদের আদর্শ বরণ করার তারা সেটা করবে৷ হল্লা মাচানোর কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না৷

তবু শোরগোল-হল্লা ইত্যাদির দরকার কারও কারও তো পড়ে বটেই৷ ২০০০-২০০১ সাল নাগাদ পাক সামরিক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) তৈরি একটি মানচিত্র ফাঁস হয়ে যায়৷ তাতে দেখা যায়, ভারতকে অনেকগুলি মধ্যযুগীয় টুকরোয় ভাগ করা হয়েছে৷ প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র সার্বভৌম রাষ্ট্র৷ যেমন, রাজপুতানা, ব্রজ, কলিঙ্গ, ইত্যাদি৷ ঠিক তেমনই আরও একটি রাষ্ট্র ওই মানচিত্রে ছিল— বঙ্গ৷ তাই, যবে থেকে এ রাজ্যে ফের ‘বঙ্গে’র ধুয়ো উঠল তখন বুঝতে অসুবিধা হয়নি— কারা এতে ধুনো দিচ্ছে৷ ধুনো দিচ্ছে তারাই, যারা কোনও না কোনও ছুতোয় কাশ্মীর উপত্যকায় অশান্তি পাকাচ্ছে বারংবার৷

আমরা বাঙালিরা, বিশেষ করে পেটে সামান্য বিদ্যেওয়ালা বাঙালিরা বরাবরই নাকি একটু বিদ্রোহী, একরোখা৷ আমরা সব কিছুতেই গলা চড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে ভালোবাসি৷ যদিও এমন সে প্রতিবাদের ভাষা, যা অনেকেই বুঝতে পারে না৷ ঠিক যেমন, বাংলার কমিউনিস্টদের সম্পর্কে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ওঁরা যে কেন (পার্লামেন্টে) এত চিৎকার করেন এবং কী বলতে চান সেটা বুঝে উঠতে পারি না৷ মাঝখান থেকে যুগ যুগ ধরে এত চিৎকার-চেঁচামেচির নিটফল হল— তাদের নিজদলের সন্তানসন্ততিরাও মার্কসবাদের অ-আ-ক-খটুকুও জানে না৷ ‘ডঃ’ ও ‘ডাঃ’ নিয়েই আপনাতে আপনি মুগ্ধ হয়ে আছে৷ যদিও বহুদিন আগে শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন সিরিজের একটি কাহিনিতে লিখেছিলেন— হর্ষবর্ধন তাঁর পাড়ার ধোপার গাধাটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে গিয়ে তাকে একটা ‘ডঃ’ দেওয়ার জন্য যারপরনাই পীড়াপীড়ি করছেন৷ বলছেন, যত টাকা লাগে দেব, কিন্তু ওকে একটা ‘ডঃ’ দিন৷ ও খুব ভালো, মুখ বুজে খাটে, কিচ্ছুটি বলে না৷ বাস্তবে এটাই বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতির কয়েক দশকের হাল৷ দেখেশুনে নীরদ সি চৌধুরী তো ১৯৩০-এর দশককেই বাংলা সংস্কৃতির শেষ পাদ বলে ঘোষণা করে গিয়েছেন৷ আমাদের মতো মূর্খরা না হয় টেনেটুনে সেটাকে আরও ৫০টা বছর টানতে পারি৷ কিন্তু কথাটা যে তিনি খুব ভুল বলে যাননি তা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে৷

এই অবস্থায় আগামী দিন যে আরও কত সঙিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ আমার এক বন্ধুর বাবা এক বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবীকে একবার বলেছিলেন, ‘‘আসলে মুশকিলটা কোথায় জানেন? আমাদের ঐতিহ্যটা শুরু হয়েছে শ্রীচৈতন্য থেকে৷ আর, আপনারা সবে শুরু করেছেন৷ এখনও অনেক সময় লাগবে৷’’ এই কথাটা সাহস করে বলার মতো মানুষ পশ্চিমবঙ্গে এখন কমে যাচ্ছে৷ কারণ, ধর্মনির্বিশেষে এ রাজ্যের নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশি কালচারেই অনেকখানি রপ্ত হয়ে গিয়েছে৷ এটা বোধহয় কারও কারও গেমপ্ল্যানেরই অঙ্গ ছিল৷ ফেসবুক আর সেলফি তাদের আরও সুবিধা করে দিয়েছে৷

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.