শেখর দুবে, কলকাতা: হেঁদুয়াতে ৯ নং অভেদানন্দ রোডের উপর পুরনো দিনের বাড়িটার গায়ে লেখা কেশব ভবন। সামনে সেরকম লোকজন নেই। গেটে সিকিউরিটিদের ভিড় নেই। সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে অভাবনীয় ফল করে মুরলীধর লেনের বিজেপি পার্টি অফিস যখন নাচ, গান, আবির খেলা, বাজি ফাটানোতে ব্যস্ত, তখন একেবারেই উল্টো ছবিটা ধরা পড়ল বঙ্গ আরএসএসের সদর দফতরে। ভীষণ রকমের শান্ত কেশব ভবন।

যুদ্ধ জয়ের তৃপ্তি থাকলেও উন্মাদনা নেই আরএসএস কর্মীদের। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১১টিতে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। পাহাড় এবং জঙ্গলমহলেও শাসক শিবিরে প্রায় নিরঙ্কুশ জয় এসেছিল। তিনবছর আগেও মাত্র তিনটি বিধানসভা আসন নিয়ে রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলের জায়গা থেকেও অনেকটা দূরে ছিল বিজেপি।

কিন্তু সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের ফল সব হিসেব উল্টে দিয়েছে। ১৮টি লোকসভা সিট জয়ের পাশাপাশি ভোটের অনুপাতে (নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুসারে) ১২১টি বিধানসভা আসনে এগিয়ে গিয়েছে বিজেপি। ৪৭ টি কমে ১৬৪টি বিধানসভা আসনে নেমে এসেছে বিজেপি। উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহলে বিজেপির সেরকম সংগঠন না থাকা সত্ত্বেও কোন জাদুবলে এই অভাবনীয় সাফল্য এসেছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বাংলা আরএসএস সদর দফতরে যাওয়া। পৌঁছেই অবাক হয়েছিলাম। শেষ দশবছরে বাংলার রাজনীতিতে সবচেয়ে চর্চিত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা এত নিস্পৃহ কেন?

উত্তর দিলেন আরএসএসের এক শীর্ষ নেতা, “আমরা কোনও রাজনৈতিক দল নই। হ্যাঁ, যে কোন রাষ্ট্রবাদী রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসুক এটা আমাদেরও চাওয়া, কিন্তু ওটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য নয়। আমাদের কাজ ধারাবাহিক।” একটু আগেই লিখেছি সিকিউরিটির আধিক্য নেই কেশব ভবনে। তবে গোপনীয়তা রক্ষার একটা ব্যাপার রয়েছে পুরো বাড়িটাতে। সংবাদমাধ্যমের জন্য দরজা খোলা থাকলেও এখানের কেউ রাজনৈতিক দলের নেতাদের মতো মুখ খোলেন না সহজে। কেশব ভবনের তিনতলায় বঙ্গ আরএসএসের এক শীর্ষ নেতার মুখোমুখি বসে প্রশ্ন করলাম, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহলে বিজেপির আহামরি সংগঠন না থাকা সত্ত্বেও অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে আরএসএস।

এটা কতটা ঠিক? সামনে বসে থাকা ভদ্রলোক অল্প হাসলেন, তারপর বললেন, “আমি তো আর রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ নই যে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো। মানুষ যে দলকে ঠিক মনে করেছে তাদের ভোট দিয়েছে। আমরা ভোটের আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছি।” তার মানে বলছেন বাংলায় বিজেপির এই চমকপ্রদ রেজাল্টের পেছনে আরএসএস-এর কোনরকম হাত নেই? একটু গম্ভীর হয়ে আরএসএস শীর্ষ নেতা বললেন, “বিজেপির জয়ে মানুষ এবং সংবাদমাধ্যম আরএসএস-কে আলোচনা করছে। আলোচনা যখন হচ্ছে তখন কোথাও কোনও কাজ হয়ে থাকতে পারে। আসলে কি বলুন তো আমরা অনেকটা হাওয়ার মতো। সবাই জানে আছি, কিন্তু দেখা যায় না। “