আলিপুরদুয়ার: অসমে একের পর এক শকুনের মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন পরিবেশপ্রেমীরা৷ অনুমান, বিষক্রিয়ার ফলে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৫০টি শকুনের৷

গত কয়েক দিনে অসমের শিবসাগর ও নওগাঁও এলাকায় কমপক্ষে ৫০টি শকুনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে৷ দেশের একমাত্র শকুন সংরক্ষণকারী সংস্থা বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা এমনটাই দাবি করেছেন৷ জানা গিয়েছে, রাজ্যে যে শুধু ৫০টি শকুনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে, তা নয়৷ আরও ১৪টি অসুস্থ শকুনের চিকিৎসা চলছে অসমের কামরূপ জেলার রানি শকুন প্রজনন কেন্দ্রে৷ প্রাকৃতিক পরিবেশে এক সঙ্গে এত শকুনের মৃত্যু এই প্রথম বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা৷

মৃত শকুনদের মধ্যে অতি বিরলতম হোয়াইট ব্যাকড্ ও স্লেন্ডারবিল্ট প্রজাতির শকুনের মৃতদেহ মেলায় বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মাত্রা বেড়েছে৷ এছাড়াও প্রচুর হিমালয়ান গ্রিফনও মারা গিয়েছে৷ মৃত্যুর কারণ নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত হয়ে গিয়েছে৷ তদন্তে জানা গিয়েছে, শিবসাগর ও নওগাঁওয়ের অরণ্য সংলগ্ন গ্রামগুলিতে বেশ কিছুদিন ধরে বুনো কুকুর ও শেয়ালের উতপাৎ মাত্রা ছাড়িয়েছে৷ ফলে যখন তখন নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছিল একের পর এক গবাদি পশু৷ তাই ও উপদ্রব থেকে মুক্তি পেতে গ্রামবাসীরা তীব্র কীটনাশক মিশিয়ে গবাদিপশুর দেহ বেশ কয়েক জায়গায় ফেলে রেখেছিলেন৷ তাঁদের ধারণা ছিল ওই মৃতদেহ খাবার পর কিছু কুকুর শেয়ালের মৃত্যু হলেই তারা আর ওই এলাকায় হানা দেবে না৷ কিন্তু আকাশ থেকে ওই খাবার নজর এড়ায়নি শকুনের৷ দলদলে শকুনের ঝাঁক নেমে এসেছিল ওই খাবারের লোভে৷ কীটনাশকের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে ওই মাংস খাওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুহয় শকুনের৷

বিষয়টি জানা মাত্রই মাঠে নামেন বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটির সহকারী ডাইরেক্টর ও বিশিষ্ট পক্ষী বিশেষজ্ঞ শচিন রানাডে ও তাঁর দলবল৷ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় কমপক্ষে ৫০টি শকুনের মৃতদেহ৷ পুড়িয়ে ফেলা হয় ওই বিষ মিশ্রিত গবাদি পশুগুলির দেহাবশেষ৷ সঙ্গে গ্রামবাসীদের বোঝানোর কাজও শুরু করা হয়৷ কিন্তু তাতেও উদ্বেগ কমছে না৷ শচিন রানাডে জানিয়েছেন “সত্যিই এক বড় বিপর্যয়৷ আমরা দিনরাত কাজ করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করছি৷ ঠিক কী ধরনের কীটনাশক ব্যাবহার করা হয়েছে তা নিশ্চিত হতে মৃত শকুনের দেহ পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে৷ রাজ্য বনদপ্তরও আমাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করছি।”

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় গবাদিপশুদের দেহে ব্যাথা উপশমের ওষুধ ডাইক্লোফেনাকের প্রয়োগ করা হত৷ ফলে বিষক্রিয়ার শরিক হয়েছিল শকুনরাও৷ এরপর পৃথিবী জুড়ে ডাইক্লোফেনাকের ব্যাবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে WHO৷ সেই সঙ্গে আান্তর্জাতিক পর্যায়ে শকুন সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হয়৷ তারই অঙ্গ হিসেবে ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি ফর ইন্টারন্যাশনাল বার্ড কনজারভেশন অথরিটির আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় দেশে শকুন সংরক্ষণের কাজে হাত দেয় বম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি৷ তাদের উদ্যেগে হরিয়ানার পিঞ্জরের জটায়ু পক্ষীরালয়, পশ্চিমবঙ্গের বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের রাজাভাতখাওয়া ও অসমের কামরূপের রানিতে দেশের মধ্যে প্রথম শকুনদের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়৷ বর্তমানে ওই তিন কেন্দ্রে প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি বিভিন্ন প্রজাতির শকুন রয়েছে৷ এমন পরিস্থিতিতে অসমের এই বিপর্যয় এক বড় বাধা হয়ে দাঁড়াল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা৷

বিএনএইসএস-এর ডেপুটি ডাইরেক্টর ও বিখ্যাত বিজ্ঞানী ডঃ বিভূপ্রকাশ জানিয়েছেন “অসমের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে মানুষের সচেতনতার এখনও কতটা অভাব৷ শকুন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এ এক বড় বিপর্যয়৷” তবে ওই গবাদি পশুগুলির দেহে ডাইক্লোফেনাকের কোন প্রভাব ছিল না বলে জানিয়োছোন তিনি৷ কারণ, ওই ওষুধখেলে প্রায় পাঁচ দিনের মাথায় শকুনের মৃত্যু হত৷ কিন্তু অসমের শকুনগুলি দশ মিনিটের মধ্যেই মরে গিয়েছিল৷

রাজ্যের বন্যপ্রাণ শাখার প্রধান মুখ্যবনপাল রবিকান্ত সিনহা মানুষের সচেতনতার উপর জোর দিয়েছেন৷ বলেছেন, ” মানুষ সচেতন না হলে শকুন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ হবে৷ কোটি কোটি টাকা খরচ করে এতটা এগিয়ে যাওয়ার পর এই পরিণতি সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক৷”