কাজি মাসুম আখতার: ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে রমজান মাসে সংগঠিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ৷ বদরের যুদ্ধ৷ যা ছিল ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার প্রথম যুদ্ধ৷ যে যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন খোদ নবি হজরত মহম্মদ (সঃ)৷ না, রোজার উপবাস বাধা হয়ে ওঠেনি৷ ক্রুসেডের যুদ্ধে মুসলিমদের জয় বা মুসলিমদের স্পেন বিজয় সম্পন্ন হয়েছিল রমজানের এই পবিত্র মাসেই৷ ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠা তথা ইসলামিক ক্ষমতায়নের প্রয়োজনে একাধিক লড়াইয়ে সাক্ষী থেকেছে রমজান মাস৷

 

ধর্মমতে একমাস ব্যাপী রমজানের উপবাস এলে মুসলিমদের খোদাভীরুতা (তাকওয়া) সংযম ও আত্মত্যাগের পরীক্ষা৷ লক্ষ্য, ন্যায় ও সত্যকে প্রতিষ্ঠা৷ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তার অন্যতম মাধ্যম৷ অবাধ ভোটদানের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বড় শর্ত৷ প্রাত্যহিক প্রতিটি বৈধ কাজকে সুসম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে রোজাপালন স্বয়ং নবির নির্দেশ৷

তাহলে রমজান মাসে ভোট করাকে কেন্দ্র করে এত হইচই কেন? স্মরণীয় যে, ২০১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে পাঁচ দফায় পঞ্চায়েত ভোট হয়েছিল এই রমজান মাসেই৷ তখনও রাজ্যের একাধিক মুসলিম সংগঠন যৌথভাবে কলকাতার রাজপথে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে মহামিছিল করে সরব হয়েছিল৷ সেবার পিছু হটেনি কমিশন৷

এবার নির্বাচন কমিশনকে পিছু হটতে হল৷ সিদ্ধান্তহীনতা ও দোদুল্যমানতার দরুন প্রথম থেকেই ন্যূব্জ রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে কাত করা সহজ হল৷ কমিশন প্রথমে তিন দফায় পঞ্চায়েত নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলেও মনোনয়ন পর্বে নজিরবিহীন হিংসার প্রেক্ষিতে আদালতের রায়ে ভোটের দিন পিছিয়ে দেয়৷ পরবর্তীতে ভোটের নির্ঘণ্ট মূল্যায়িত হওয়ার সময় সামনে আসে দুটি ইস্যু৷
এক) বর্ষার আগমন, যা ভোট প্রক্রিয়ার অন্তরায়৷ দুই) রমজান মাস, ১৭ মে থেকে শুরু এই রমজানে ভোট হলে না কি মুসলিমদের ধর্মাচরণে ব্যাঘাত ঘটে৷ বিতর্ক এই দ্বিতীয় ইস্যু নিয়েই৷

খবরে প্রকাশ, কমিশন নাকি প্রথমে ভোট করাতে অন্তত দুই দফায় পঞ্চায়েত নির্বাচন করাতে চেয়েছিল৷ সময়াভাবে যার এক দফা পড়েছিল রমজানের মধ্যেই৷ কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নির্বাচন কমিশনার যে ২০১৩ সালের মীরা পাণ্ডে নন! তাছাড়া, রাজ্যের শাসক দল তথা সরকার ‘মুসলিম প্রীতি’-র তকমা কেন হারাবে? বিজেপি ছাড়া বাকি বিরোধী দলগুলির অবস্থাও যে তথৈবচ! রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলিম নাগরিকদের ভোট ব্যাংকেও যে তাদের অংশীদার আছে, এই সত্য উপলব্ধি করে কমিশন রাজ্যের কয়েকটি মুসলিম সংগঠনের স্বঘোষিত নেতাদের সামান্য চমকানিতেই পিছু হটলেন৷ তাই রমজানের আগেই কেবলমাত্র এক দফাতেই ভোট করার নির্ঘণ্ট ঘোষিত হল৷ পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন পর্বে ঘটা ব্যাপক হিংসা,খুনোখুনি স্পষ্টতই অশনি সংকেত৷ কারণ, হিসেব অনুযায়ী রাজ্য সরকারের হাতে যত পুলিশ আছে, পঞ্চায়েত ভোটে বুথের সংখ্যা তার থেকেও বেশি৷ এই অবস্থায় এক দফায় অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে পঞ্চায়েত নির্বাচন সত্যিই চ্যালেঞ্জের মুখে৷ ফলস্বরূপ শুরু হয়েছে চাপানউতোর৷ যা পঞ্চায়েত ভোটকে পুনরায় আদালতের কাঠগড়ায় তুলেছে৷

এত কিছু আখ্যানের মূলে রয়েছে রমজান নিয়ে মুসলিমদের একাংশের অন্ধ ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং ধর্মাশ্রিত রাজনীতির কারবারিদের অশুভ মেলবন্ধনের স্বরূপ উন্মোচন৷ অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে যার মূল্য দিতে হয়েছে বারে বারে৷ রাজনীতির বলি সব চেয়ে বেশি হয়েছে তারাই৷ অথচ, ক্ষমতায়নের মধুপান থেকে তাদের থাকতে হয়েছে শত যোজন দূরে৷ আর্থ-সামাজিক-শিক্ষা সহ ক্ষমতায়নের সূচকের সর্বক্ষেত্রে তারা উদ্বেগজনকভাবে পশ্চাদপদ৷ তবুও তাদের পিছনে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে তোষণের তকমা৷ বাস্তবে এহেন তকমার উৎসমূলে রয়েছে নির্ভেজাল ধর্মীয় সুড়সুড়ির মাধ্যমে শস্তায় মুসলিম ভোট লুণ্ঠনের চিরায়ত অপকৌশলটি৷ ধর্ম ছাড়া মুসলিমদের পৃথক কোনও সত্তা যেন থাকতেই পারে না৷ ‘মাইন্ড সেট’টি এ রকমই৷ মুসলিম সন্ত্রাসবাদের ইস্যুই হোক বা নামাজ, রোজা বা হজ পালনের ইস্যুই হোক– এই মাইন্ড সেটের কাছে সব কিছুই যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে৷ যে মাইন্ড সেটের বলি হয়েছে এ দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণকারী অমুসলিম নেতারাজ৷

তাই, প্রগতিশীল মুসলিমরা নন, যুগ যুগ ধরে অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত, আগাছার মতো পরজীবী কিছু ধান্দাবাজ ধর্মীয় নেতা ও অঙ্গভঙ্গিসর্বস্ব দুর্বৃত্তায়নে যুক্ত কিছু ধর্মীয় মাতব্বরদেরই, বিশেষ করে এই রাজ্যের রাজনীতির রথী-মহারথীরা ‘মুসলিম মুখ’ হিসাবে দেখতে অভ্যস্ত৷ অসুখের মূল এখানেই৷ তাই মুসলিমরা উন্নয়নের সূচকে চরমভাবে পিছিয়ে থাকলেও তাদের জন্য রয়েছে ইমাম ভাতা, হজ হাউস, ১০ হাজার মাদ্রাসার ঘোষণা, শহরের মুসলিম মহল্লায় বেআইনি বিল্ডিং নির্মাণের অবাধ সুযোগ, ৬৫ ডেসিবেলের তোয়াক্কা না করে মুসলিম মহল্লায় তারস্বরে সারারাতব্যাপী ধর্মীয় জলসা বা গানবাজনা করার ছাড়পত্র, অমুসলিম নেতানেত্রীদের যত্রতত্র ইনসাল্লাহ, ইনসাল্লাহ বুলি, টুপি বা হিজাব পরিধান, ইফতারের আয়োজন বা তসলিমা নাসরিনদের বিতাড়নে সরকারি সিলমোহর ইত্যাদি, ইত্যাদি৷

রমজানে ভোট করতে না-দেওয়া– এহেন তোষণের (আসলে শোষণ) অভিযোগের তালিকাকে নিশ্চিত করে আরও দীর্ঘতর করবে৷ স্বাভাবিকভাবে,নিউটনের তৃতীয় সূত্রকে মান্যতা দিয়ে মুসলিম তোষণের অভিযোগে হিন্দু জনমতকে সংগঠিত করা হবে৷ হচ্ছেও তাই৷ এ রাজ্যের মাটিতে তাই ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে হিন্দুত্ববাদের আদর্শ৷ প্রতিবেশী সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা এতদিনকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঁধনও যেন ক্রমেই আলগা হয়ে পড়ছে৷ তাই ক্ষুদ্র কারণেই রাজ্যের এখানে-ওখানে ঘটছে দাঙ্গার মতো ঘটনা৷ উদ্বেগের কারণ এখানেই৷

প্রশ্ন হল, মুসলিম তোষণ বা মুসলিম প্রীতির লেবেল সাঁটিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ মুসলিমরা কেন দেবেন? কেন অহেতুক সংখ্যাগুরু প্রতিবেশীদের কাছে নিজেদেরকে শত্রু করে তুলবেন? তাদের স্মৃতি কি এতটাই দুর্বল? স্বাধীনতার প্রাকমুহূর্তের সাম্প্রদায়িক হিংসার প্রেক্ষাপট কি তাদের জানা নেই?

উদ্বেগের অন্য দিকও রয়েছে৷ পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন পর্বে হিংসার নেপথ্যে যেই থাকুক না কেন– মাঠে নেমে হিংসা, খুনখারাপির গুরুদায়িত্ব কিন্তু মুসলিম ভোটগুণ্ডারাই কাঁধে তুলে নিয়েছিল৷ তাই আক্রমণকারী বা আক্রান্ত আহত-নিহতদের তালিকায় জ্বল জ্বল করছে প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিমের নাম৷ নিহতদের ১৪ জনের মধ্যে ১২ জনই মুসলিম– এই মর্মেই খবর বেরিয়েছিল৷

আসলে প্রতিটি ভোটযুদ্ধের এমনটাই দস্তুর৷ মারে মুসলমান, মরেও মুসলমান– এই শব্দবন্ধটি যেন আজ প্রবাদে পরিণত হয়েছে৷ অন্তত এই রাজ্যের নিরিখে৷ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রয়োজনে মুসলিম লাঠিয়ালরাই যে নেতানেত্রীদের মূল ভরসা! তাদের অনগ্রসরতা, অসচেতনতাই এখানে হাতিয়ার৷ অপর দিকে কোন এক অমোঘ টানে বা স্বার্থে মুসলিমদের একাংশ পার্টির জন্য আত্মবলিদান দিয়ে ‘শহিদ’ হতেও কুণ্ঠিত হয় না৷ অতীতে কংগ্রেস, সিপিএম থেকে শুরু করে বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের স্বার্থে মুসলিমদের শহিদ হওয়ার দীর্ঘ তালিকাটি অন্তত তাই বলে৷

উল্লেখ্য যে, পঞ্চায়েত ভোটের মনোনয়ন ঘিরে হিংসার নিরিখে ভোটের সময় হিংসার বহর কী হবে– তা ভেবে আমরা রীতিমতো আশঙ্কিত৷

ওই হিংসায় দারিদ্রসহ অনুন্নয়নের সর্বক্ষেত্রে প্রায় ৮০ শতাংশ জায়গা দখল করা মুসলিমরাই যে নেতৃত্ব দেবেন– তা কি বলার অপেক্ষা রাখে?

ঠিক এই মূল্যায়নে আমার মনে হয় পবিত্র রমজান মাসে ভোট হলে খোদাভীরুতার কারণে মুসলিম ভোটযোদ্ধারা হয়তো খুনোখুনি তথা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে একটু কম যুক্ত হতেন৷ তাদের নেতাপ্রভুদের দ্বারা একটু কম ব্যবহৃত হতেন৷ একটু কম শহিদ হতেন৷ আত্মশুদ্ধির সাধনায় রত থাকায় উপবাসরত মুসলিমদের জ্ঞানচক্ষু হয়তো প্রসারিত হত একটু বেশিই৷ সংযমের শিক্ষাও হয়তো তাদের হিংসা পরিহারে আরও একটু সাহায্য করত৷ সেক্ষেত্রে রমজান হয়ে উঠত আরও বেশি সার্থক৷ ইসলাম তো গণতন্ত্র রক্ষারও শিক্ষা দেয়৷ শাসক বা প্রতিনিধি নির্বাচনে গণভোট যে ইসলামিক বিধি৷ রমজানের পবিত্র মাসে গণতন্ত্রের বিধি সুষ্ঠুভাবে পালিত হলে কী ক্ষতি হত? ইসলামের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার সঙ্গে ভোটের কোনও বিরোধ আছে না কি?

ধর্মের দোহাই দিয়ে রমজান থেকে ভোট সরিয়ে এনে নির্বাচন কমিশনকে এক দফায় ভোট করাতে বাধ্য করায় যদি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন বিপন্ন হয়,যদি বাড়ে হিংসার বহর, আরও অধিক সংখ্যক মা, বোন বা স্ত্রীকে যদি তাদের প্রিয়জনকে হারাতে হয়, মুসলিম মহল্লায় মহল্লায় যদি বাড়ে হিংসার হানাহানি– রমজানে ভোটবন্ধের পক্ষে আওয়াজ তোলা মুসলিম নেতারা কি তার দায় নেবেন? নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে যাদের এত লম্ফঝম্ফ! ইসলামকে আর কত কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা চালাবেন তাঁরা? বাস্তবে তাদের জন্যই তোআজ মুসলিমদের দুরবস্থা সাচার কমিটির বঞ্চনার সূচকে জ্বলজ্বল করছে৷

স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও কেন মুসলিমদের এত করুণ দশা, এ নিয়ে ওই মুসলিম নেতাদের কোনও মাথাব্যথা নেই৷ কেবলমাত্র কষ্টকল্পিত ধর্মরক্ষা নিয়েই এদের যত উদ্বেগ! এদের যুক্তি (সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মুসলিমদের নয়) রমজানে ভোট হলে রক্তপাত হবে৷ যা রোজার পবিত্রতাকে নষ্ট করবে৷

তাহলে কি অন্য মাসে ভোটযুদ্ধে রক্তাক্ত হওয়া ইসলাম ধর্মে বৈধ? কোথায় গেল রোজাপালনকারীদের শান্তি ও সংযমের সাধনা, খোদাভীরুতার ট্রেনিং? খোদ নবি মহম্মদ (সঃ) রমজান মাসে বদরের যুদ্ধে সেনাপতিত্ব করেছিলেন৷ ওই যুদ্ধে অসংখ্য যোদ্ধার রক্তপাত হয়েছিল৷ মৃত্যুবরণ করেছিল অসংখ্য মানুষ৷ প্রশ্ন হল, স্বঘোষিত মুসলিম নেতারা নবি মহম্মদ (সঃ)-র চেয়েও বড় মুসলমান না কি?

বাস্তবে দেখেছি, মুসলিমরা রমজানে রোজা রেখে সারাদিন জুড়ে ব্যাবসা-বাণিজ্য, চাষবাস, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ সবই করেন৷ এইভাবে দৈনন্দিনের সব কাজ সম্পন্ন করার মধ্যে দিয়ে রোজা পালন ধর্মের নির্দেশেই রয়েছে৷ সবল উপবাসের ধর্মীয় মাহাত্ম্য ঠিক ওই জায়গাতেই৷ সুতরাং, শুয়ে-বসে বা অলসভাবে সকাল, দুপুর, বিকেল অতিবাহিত করে নয়, বরং বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে জমিতে হাল চালনার মধ্যেই রয়েছে রোজা পালনের সার্থকতা৷ ইলেকট্রিক বিল দিতে বা রেশন তুলতে লাইনে দাঁড়ানোর মতো দৈনন্দিন কাজগুলি রোজা রেখেও করতে হয়৷ তাহলে কিছুক্ষণ ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে রোজাদারদের ভোট দিতে বিপত্তি কোথায়? আসলে বিপত্তিটি রয়েছে ধর্মীয় জিগির ও ভড়ংসর্বস্বতার মধ্যে৷ গণতন্ত্ররক্ষার কোনও দায় কি ইসলাম এবং ভারতীয় সংবিধান তাদের উপর বর্তায়নি?

প্রশ্ন উঠেছে উপবাসরত ভোটকর্মীদের সমস্যা নিয়েও৷ উত্তরে বলা যায়, দূরবর্তী স্থানে চাকুরি বা অন্য কাজে কর্মরত রোজাপালনকারীগণ অনেক ক্ষেত্রেই বাসে-ট্রেনে-চলার পথে ইফতার করতে বাধ্য হন৷ এমনটাই বাস্তবিক এবং একইসঙ্গে ইসলামসম্মত৷ তাহলে শুধু ধর্মকে হাতিয়ার করে কিছু মুসলিম ভোটকর্মীদের ঢাল বানিয়ে রোজায় ভোট না করতে দেওয়াকে অপচেষ্টা ছাড়া আর কী-ই বা বলা যেতে পারে৷

আবার রমজান মাসে ভোট হলে ভোটের দিনে মুসলিম ভোটগুণ্ডাদের সাহায্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ও থাকতে পারে ভোট-রাজনীতি নিয়ন্ত্রকদের একাংশের৷ রমজান মাসে ভোট হলে ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের কারণে মুসলিম ভোটগুণ্ডাদের কেউ কেউ বুথ দখল,বোমাবাজি, খুনখারাপি করতে যদি নিমরাজি হয়! তারা অন্যায়, অবৈধ কাজে লিপ্ত হতে যদি অরাজি হয়, তাহলে যে সমূহ সর্বনাশ! তারাই তখন তাদের পদলেহনে অভ্যস্ত মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের রমজানে ভোট বন্ধ করাতে নির্বাচন কমিশনের কাজে লেলিয়ে দেবেনই– রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এটিই যে অনিবার্য অঙ্গ!

রমজানে ভোটবন্ধের ফতোয়াবাজদের আরও প্রশ্ন– হিন্দুদের কোনও পুজোয় ভোটের দিন ঘোষণা হলে, তাঁরা কি মেনে নিতেন? তাহলে মুসলিমরাই বা কেন মানবেন?

উত্তরে বলি, কালীপুজো, সরস্বতী পুজো বা দোল উৎসব হোক বা ইদ-উল ফিতর, ইদুজ্জোহা, বড়দিন হোক– এই উৎসবগুলি সাড়ম্বরে উন্মাদনার মধ্যে উদযাপিত হয়৷ তাই এই আনন্দ উৎসবগুলিতে থাকে সরকারি ছুটি৷ অন্যদিকে, রোজার উপবাস ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের নীরব সাধনার বস্তু৷ যা উদযাপনের প্রয়োজন হয় না৷ যেখানে আড়ম্বরের ছিটেফোঁটাও নেই৷ ধর্মেও নেই অনুমতি৷ যেমন অনুমতি নেই দিনান্তে উপবাসভঙ্গের জন্য আয়োজন করা খাবারের৷ ‘ইফতার’-কে ‘ইফতার পার্টিতে’-তে রূপান্তরিত করে রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মুসলিম প্রীতির মহড়া করার ভণ্ডামিরও অনুমতি ইসলাম দেয়নি৷ রোজা যদি সরকারি ছুটিতে অনুষ্ঠিত সাড়ম্বরে উদযাপিত ধর্মীয় অন্য অনুষ্ঠানগুলির সমতুল্য হত, তাহলে এই রাজ্যে এক মাসের রমজানে সরকারি ছুটি কেন ঘোষিত হল না? ইসলামের স্বঘোষিত রক্ষকরা এই ইস্যুতেও রাস্তায় নামবেন না কি?

সুতরাং, কেবলমাত্র ধর্মীয় আবেগপ্রসূত বলেই তাতে মর্যাদা দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়৷ দেখা দরকার ওই আবেগের যুক্তিগ্রাহ্যতা ও বলিষ্ঠ ভিত্তি আছে কিনা৷ নইলে গোভক্তিপ্রসূত হিংসা, লাভ জিহাদের মতো ধর্মীয় আবেগকেও মান্যতা দিতে হয়৷

পরিশেষে বলি, দু-এক দিনের ধর্মীয় উৎসব আর এক মাসব্যাপী রমজান কখনও এ-ক হতে পারে না৷ বর্ষার কারণে, রমজানের পর ভোট সম্ভবপর ছিল না৷ মুসলিমপ্রেমী(!) রাজনৈতিক দলগুলি তথা মুসলিম ধর্মীয় মাতব্বরদের চাপে রমজানেও ভোট করা গেল না৷ এমতাবস্থায়, সময়াভাবে রমজানের আগে ভোট করার বিড়ম্বনা রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে নিতেই হল৷ বিনিময়ে মুসলমানদের তুষ্ট করার তকমা নিতে হবে৷ এক দফায় পঞ্চায়েত ভোটে ব্যাপক হিংসা হলে নিতে হবে তার অভিশাপও৷ সুতরাং প্রস্তুত থাকুন৷

(লেখক দক্ষিণ কলকাতার কাটজুনগর স্বর্ণময়ী (উচ্চ মাধ্যমিক) বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী)