টাইমস অব ইন্ডিয়ায় আজ (২১ এপ্রিল, ২০১৭) একটি বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে৷ লেখক রাঘবন জগন্নাথন৷ লেখক খুব সঠিকভাবেই কাশ্মীর উপত্যকার সাম্প্রতিক অশান্তির পিছনে চীনের ইন্ধন জোগানোর কথা উল্লেখ করেছেন৷ তবে, ভারতকে বিপাকে ফেলার জন্য আগামী দিনে যে পাকিস্তান-চীন ও রাশিয়ার দুষ্টচক্র তৈরি হওয়ার আশঙ্কা তিনি প্রকাশ করেছেন, সেটা খুব বাস্তবোচিত বলে মনে হচ্ছে না৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

চীন ও পাকিস্তানের ভাব-ভালোবাসা নতুন কোনও ব্যাপার নয়৷ সেই ১৯৫০-এর শেষ এবং আরও বিশেষ করে ১৯৬০-এর শুরু থেকেই চীন ও পাকিস্তানের শাসককুলের মধ্যে একটা অদ্ভূত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে তা আরও মাখো মাখো হয়েছে৷ ‘বর্তমানে’ থাকতেই একবার একটি সম্পাদকীয়তে লিখেছিলাম, চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্কটা বরাবরই অবৈধ সহবাসের মতো৷ পাক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈধ গাঁটছড়াটা আমেরিকার প্রশাসনের বটে, কিন্তু পাশাপাশি চীনের সঙ্গে উদ্দাম পরকীয়ায় কখনই ইসলামাবাদের কোনও রকম অরুচি ছিল না৷ সে কারণেই ১৯৭০-এর দশক থেকে লালচীনের শাসকরা পাক শাসককুলের ‘সমস্ত ঋতুর বন্ধু’৷ ১৯৭৯ সালের পর থেকে এখন তো ব্যাপারটা একেবারেই খুল্লামখুল্লা৷

ইদানীং নানা ঘটনাবলীতে মনে হতে পারে, রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে এবং সেইসূত্রে ইসলামাবাদের সঙ্গেও তাদের একটি সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে৷ হতে পারে, সিরিয়া নিয়ে নয়া মার্কিন প্রশাসনের গোঁয়ার্তুমি ক্রেমলিনকে একটা নতুন সমীকরণের ছক তৈরি করতে বাধ্য করছে৷ কিন্তু তার জন্য ভোলগা-গঙ্গা সম্পর্কে চিড় ধরবে, এটা মনে করা ভুল৷ বহু বছর আগে ক্রেমলিনের পাঠানো রাষ্ট্রদূত দিল্লিতে এবং সেইসঙ্গে কলকাতাতেও এসে বলেছিলেন (গোর্কি সদনে তাঁর সেই বক্তৃতা নিজের কানে শুনেছিলাম) : দুই দেশের বন্ধুত্ব সময়ের দ্বারা পরীক্ষিত, টাইম টেস্টেড ফ্রেন্ডশিপ৷ কথাটা তিনি নিছক বলার জন্য বলেননি৷ কথাটা একেবারে আগমার্কা খাঁটি কথা৷

ক্রেমলিন বেজিংকেও যেমন চেনে, দিল্লিকেও চেনে৷ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব আখেরে তাদের কাজে লাগবে, দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতায় সেটা তারা ভালো করেই জেনে গিয়েছে৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইয়েনানে বিশ্বস্ত এজেন্ট পাঠিয়ে জোসেফ স্তালিন ঠিক যেমন মাও সে-তুংকে চিনে নিয়েছিলেন, পরবর্তীকালের একের পর এক অভিজ্ঞতা থেকেও রাশিয়ার শাসকবর্গ আপাদমস্তক মেপে নিয়েছেন বেজিংয়ের শাসকদের৷ পক্ষান্তরে, তাঁরা ভারতের বন্ধুত্বের নজিরও দেখেছেন এবং সেইমতো বন্ধুত্বের দাম বন্ধুত্বেই মিটিয়েছেন৷ এ নিয়ে অনেক কূটকচাল চলতে পারে, কিন্তু ভারতের অভিজ্ঞ কূটনীতিকরাও (এক যদি না কোনও স্বার্থান্বেষী মহলের পয়সা তাঁরা আলাদা করে খেয়ে থাকেন) নিশ্চয়ই সে কথা স্বীকার করবেন৷

দিল্লি-মস্কো সম্পর্ক কতখানি গভীর, সেটা বারংবার প্রমাণিত হয়েছে৷ ’৬২-র চীন যুদ্ধ, অতঃপর ’৬৬-র পাক যুদ্ধ, তার পর আরও ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে৷ অন্যদিকে, কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট থেকে শুরু করে আফগান যুদ্ধ, সর্বক্ষেত্রেই বেজিংয়ের শাসককুলের ‘বেইমানি’ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে মস্কো৷ সুতরাং, হঠাৎ করে তারা চীনের বন্ধুত্বে গলে যাবে এবং পিছন থেকে ছুরি খাওয়ার পুরানো যাবতীয় অভিজ্ঞতার কথা ভুলে যাবে, রুশ শাসকরা কোনও কালেই তেমন বান্দা ছিলেন না৷ আন্তর্জাতিক কূটনীতির জগতে একটা কথা বারংবার বলা হয়— the Jews never forget৷ একই কথা কিন্তু মস্কোর শাসকদের সম্পর্কেও খাটে৷

মার্কিন প্রশাসনের মুশকিল হল, যে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সেখানকার পাকামাথারা আগেই তাঁদের মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের লাভ-ক্ষতি কষতে বসেন৷ কোন সিদ্ধান্ত নিলে তবেই ওই কমপ্লেক্সের হর্তাকর্তারা গোঁসাঘরে খিল দেবেন না, এটা মার্কিন প্রশাসনকে সব কিছুর আগে খেয়াল রাখতে হয়৷ এই কথা খেয়াল রাখতে গিয়েই কিন্তু ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট সব জেনেবুঝেও আগ বাড়িয়ে হিটলারকে চটাতে চাননি৷ কারণ, তাঁর দেশের সামরিক শিল্পপতিরাই তখন নাৎসি জার্মানিকে রণসাজে সাজাচ্ছে এবং প্রভূত পরিমাণে লাভের কড়ি ঘরে তুলছে৷ এখনকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বোধহয় সে কারণেই ভোটের প্রচারে এক কথা বলে এখন সম্পূর্ণত উলটো সুরে গাইছেন৷ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার চলার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করতে তিনি মস্কোর সঙ্গে কদমে কদম বাড়াবেন৷ জিতে ক্ষমতায় বসে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুণ্ডপাত করছেন৷ মাঝখান থেকে বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েনে লাভের গুড় সাপটাচ্ছে চীন, আর ইসলামবাদের মতো তাঁবেদারদের তা থেকে কিছু কিছু খুদকুঁড়োও বিলোচ্ছে৷

কিন্তু আগামী দিনে পরিস্থিতি যেখানেই গিয়ে দাঁড়াক না কেন তাতে আমার মনে হয় না যে, দিল্লির ক্ষতি হয় এমন কোনও পদক্ষেপ মস্কো নেবে৷ আবারও বলছি, মস্কো যেমন বেজিংকে হাড়ে হাড়ে চেনে, ঠিক তেমনই দিল্লিকেও তারা ভালোমতো জানে৷ চীনা গিটকিরিতে হঠাৎ করে ভোলগা উলটো দিকে বইতে আরম্ভ করবে এবং গঙ্গার সঙ্গে পত্রপাঠ যাবতীয় সম্পর্ক ঘুচিয়ে দেবে, এটা আমি বিশ্বাস করি না৷

- Advertisement -