স্বাগত ঘোষ: সংসারের দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়লে বখে যাওয়া ছেলেটা যেমন বদলে যায়, তেমনই নেতৃত্বের দায়িত্ব বদলে দিয়েছে বিরাট কোহলিকে। ২০১২ অভিজাত সিডনির বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে দর্শকদের মিডল ফিঙ্গার দেখাতে কুছ পরোয়া ছিল না তাঁর। ঘটনার পর ম্যাচ রেফারি রঞ্জন মাদুগালে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিরাটকে। কড়া শাস্তি আঁচ করতে পেরে ম্যাচ রেফারির কাছে নির্বাসনে না পাঠানোর কাতর আবেদন জানিয়েছিলেন তৎকালীন জাতীয় দলের ‘চ্যাংরা’ ছেলেটা।

শেষ অবধি ম্যাচ ফি’র ৫০ শতাংশ জরিমানাতে সে যাত্রায় রেহাই পেয়েছিলেন বিরাট। সে ঘটনা মনে পড়লে আজও হয়তো অজান্তেই জিভ কেটে ফেলেন এই গ্রহের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। না, ম্যাচ রেফারি ওইদিন সতর্ক করার পর যে বিরাট যে বাইশ গজে তাঁর আগ্রাসন দেখানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন তা নয়। বরং যত সময় গড়িয়েছে তত ব্যাটসম্যান হিসেবে নিজেকে যেমন প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনই বাইশ গজে বেড়েছিল দাপুটে বিরাটের আস্ফালন। নানা সময় ক্রিকেট মাঠে প্রতিপক্ষকে উদ্দেশ্য করে তাঁর অঙ্গভঙ্গি ছিল এক্তিয়ার বহির্ভূত। তাই ভালো ব্যাটসম্যান হিসেবে বিরাটকে মান্যতা দিলেও অনেকে ব্যক্তি বিরাটকে সার্টিফিকেট দিতে ছিলেন নারাজ।

সময়টা বদলে ২০১৪-১৫ ভারতের অস্ট্রেলিয়া সফর। ০-২ ব্যবধানে সিরিজে পিছিয়ে থাকা অবস্থাতে হঠাতই টেস্ট ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ঘটনাক্রমে চার ম্যাচের সিরিজের শেষ টেস্টটি ছিল সিডনিতেই। অর্থাৎ, যে বছরদু’য়েক আগে যে মাঠে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে শিরোনামে এসেছিলেন, ঘটনাক্রমে সেই মাঠেই জাতীয় দলের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে পূর্ণসময়ের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিরাট। পূর্ণসময়ের টেস্ট অধিনায়ক হয়ে প্রথম ইনিংসেই সেঞ্চুরি। বিরাট তখন কোহলি হয়ে ওঠার প্রোসেসের চরম শিখরে। উল্লেখ্য, অ্যাডিলেডে ওই সিরিজের প্রথম ম্যাচেও ধোনি অসুস্থ থাকায় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিরাট। হাঁকিয়েছিলেন জোড়া ইনিংসে সেঞ্চুরি।

উইলো যার কথা বলে মাঠে তাঁর অ্যাটিটিউড না থাকলে কী আর চলে। তাইতো সহজে বদলাননি বিরাট। বিরাটের আগ্রাসন কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ব্যাগি গ্রিনদের স্লেজিং’য়ের যোগ্য জবাবও হয়ে উঠেছিল। এরপর ধীরে ধীরে এল লিমিটেড ওভার ক্যাপ্টেন্সি। সবক’টি ফর্ম্যাটে যখন জাতীয় দলের দায়িত্বভার এসে পড়ল, হঠাতই বদলে যেতে থাকলেন বিরাট। ছটফটে মনোভাবটা বজায় রাখলেও বাইশ গজে ধীরে-ধীরে সংযত হতে থাকলেন ভারত অধিনায়ক। ক্রমেই দেশের তরুন-খুদে প্রতিভাদের আইডল হয়ে ওঠার কারণটাও পাশাপাশি কাজ করছিল কীনা জানা নেই, তবে বিরাটের এই বদল যে অনেকটাই পরিস্থিতির চাপে পড়ে সেটা বুঝতে খুব বড় ক্রিকেটবোদ্ধা হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না ।

বাইশ গজে সেনাপতি বিরাটের আস্ফালন ইদানিং বদলে গিয়েছে মশকরায়। দায়িত্ব কাঁধে বিরাট তাঁর সেনানীদের কাছে হয়ে উঠতে চান একজন আদর্শ দলনায়ক। যার নবতম সংযোজন ২০১৯ বিশ্বকাপ। লন্ডনে মুখোমুখি ভারত-অস্ট্রেলিয়া। ভারতের ব্যাটিং চলাকালীন গ্যালারি থেকে স্টিভ স্মিথকে উদ্দেশ্য করে উড়ে আসতে লাগল সমর্থকদের টিপ্পনি। স্যান্ডপেপার গেট কান্ডে একবছরের নির্বাসন কাটিয়ে মাঠে ফেরা স্মিথের জন্য অভিজ্ঞতাটা খুব সুখের হচ্ছিল না। ব্যাটিং’য়ের মাঝপথেই বিরাট এগিয়ে গেলেন গ্যালারির দিকে। অনুরাগীদের বললেন, ‘বিদ্রুপ কেন, করতালি দিয়ে ওকে স্বাগত জানাও।’

ক্রিকেট মাঠে সৌজন্যের এমন নিদর্শন অচিরেই স্থান করে নিল স্পিরিট অফ ক্রিকেটের নোটবুকে। এগিয়ে এসে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর প্রবলতর প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে করমর্দন করলেন স্মিথ। ১৫ জানুয়ারি, ২০২০ ওই ঘটনাই একদা দর্শকদের উদ্দেশ্যে মধ্যমা দেখানো ছেলেটাকে এনে দিল আইসিসি ‘স্পিরিট অফ দ্য ক্রিকেট’ অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কার পেয়ে হতবাক বিরাট বললেন, ‘বহু বছর ভুলত্রুটির জন্য স্ক্যানারে থাকার পর এই অ্যাওয়ার্ড পেয়ে আমি সত্যিই হতবাক।’ সত্যিই বাকি সকলের মতো দায়িত্ববোধ পরিণত করেছে বিরাটকেও। এই অ্যাওয়ার্ড যেন তারই প্রমাণ।