সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এই বাড়িতেই তিনি লিখেছিলেন আনন্দমঠ, কবিতা পুস্তক , কৃষ্ণকান্তের উইল, সাম্যের মতো বই। আবার এই বাড়িতেই রচিত হয়েছিল বন্দেমাতরম মন্ত্র। যা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধিনতা আন্দোলনের মূল মন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই বাংলায় অনেক ঐতিহাসিক বাড়ির কদর না হলেও এই বাড়ির কদর হয়েছে। সংস্কারের জন্য এখন সুস্থ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এই নিবাস, অবস্থান হুগলী জেলা। সাহিত্য সম্রাটের জন্মদিনে জেনে নিন এই বাড়ি ও বন্দে মাতরমের ইতিহাস।

১৮৭৬ সালের ২০শে মার্চ বঙ্কিমচন্দ্র হুগলীতে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেকটরের পদে যোগদান করেন। নৈহাটির কাঁঠালপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে নৌকায় ভাগীরথী পার করে হুগলী একঘন্টারও পথ নয়। সেখান থেকেই কিছুদিন যাতায়াত করার পর তিনি নৈহাটির পাট চুকিয়ে সপরিবারে হুগলী চলে আসেন। হুগলীতে এসে তিনি মালিক কাশেমের প্রাসাদের উত্তরদিকের একটি অংশ হাজীবাবার থেকে ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। হুগলীর সঙ্গে বঙ্কিমের সম্পর্ক আরও আগের।

নৈহাটিতে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করার পর তিনি হুগলী কলেজে ভর্তি হন এবং চার বছর পড়াশোনা করে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে কলকাতার হিন্দু কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি কলেজ) ভর্তি হন। হুগলী কলেজে পড়ার সময় বঙ্কিম নৈহাটি থেকে নিয়মিত নৌকা করে যাতায়াত করতেন। বঙ্কিমের সাহিত্য-প্রতিভার কথা ছড়িয়ে পরার পর জনৈকবাবু তাঁকে নাটকের দলে যোগ দেওয়ার জন্য বলেছিলেন।

তাতে লাভ হয়নি সে বাবুর। নাটক দেখার জন্য নিয়মিত হুগলীতে যাওয়া-আসা করতেন সাহিত্য সম্রাট। এর বহু বছরে পড়ে হুগলীর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হন বঙ্কিম এবং জোড়াঘাটের ওই বাড়িতে থাকা শুরু করেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী , চন্দ্রনাথ বসু, ভুদেব মুখোপাধ্যায়, অক্ষয় চন্দ্র সরকার, রামগতি ন্যায়রত্ন, তারাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত সেকালের স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিকরা নিয়মিত বঙ্কিমের সান্নিধ্য লাভের জন্য জোড়াঘাটের এই বাড়িতে এসেছেন।

জোড়াঘাটের এই বাড়িতে বঙ্কিমচন্দ্র পাঁচ বছর বসবাস করেছিলেন। এই পাঁচটি বছর তাঁর সাহিত্যরচনার পরিপ্রেক্ষিত থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়েই প্রকাশিত হয় রজনী (১৮৭৭), উপকথা (ইন্দিরা, যুগলাঙ্গুরীয় ও রাধারানী একত্রে) (১৮৭৭), কবিতা পুস্তক (১৮৭৮), কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৯), সাম্য (১৮৭৯) প্রভৃতি বই। হুগলীতে চলে আসার ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার কাজ আবার চালু হয়।

‘কমলাকান্তের পত্রাবলী’, ‘রাজসিংহ’, ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’, ‘কমলাকান্তের জবানবন্দী’, ‘আনন্দমঠ’ প্রভৃতি উপন্যাসগুলি একে একে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। ১৮৮০ সালের ১৫ই জুলাই চুঁচুড়া থেকে নবীনচন্দ্র সেনকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায় যে এই বাড়িতে বসেই তিনি রচনা করেছিলেন আনন্দমঠ এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস। স্থানীয় বেশ কিছু সাহিত্য ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে আনন্দমঠের প্রাণস্বরূপ ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রটি রূপগ্রহণ করেছিল

জোড়াঘাটের এই বাড়িতেই। আর সেই মতকে মান্যতা দিয়েই বঙ্কিমের এই বাড়িটি বর্তমানে ‘বন্দেমাতরম ভবন’ নামে এলাকায় পরিচিতি লাভ করেছে। ‘আনন্দমঠ’ বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হওয়ার ঠিক আগে বঙ্কিম হুগলী ছেড়ে হাবড়া চলে যান।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV