সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : চমকে গিয়েছিলেন উত্তম কুমার। মদের নেশায় চুর ভদ্রলোক। হ্যাঁ ভদ্রলোক তো বলতেই হয়। নামটা যে ঋত্বিক ঘটক। সিনেমা তৈরি , ফ্রেম সেন্স নিয়ে বহুবার বহু মানুষকে চমকে দিয়েছিলেন। তবে উত্তম কুমার ভাবতে পারেননি তাঁকে এমন ভাবে চমকে দেবেন ঘটকবাবু।

সালটা ১৯৭০। সারাদিন শুটিং শেষ করে বাড়ি ফিরেছেন উত্তম কুমার। পরের দিনও শুটিং, তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার প্ল্যান। শুয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছেন, হঠাৎ সদর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। বারান্দা থেকে দেখেন এক দীর্ঘদেহী মানুষ দরজায়। ‘একটু নামবেন অরুনবাবু, কথা ছিলো’, ‘অরুন’ নামটা শুনে তাড়াতাড়ি নেমে গেলেন মহানায়ক। ‘একটা স্ক্রিপ্ট শোনাবো আপনাকে – একটু আসতে হবে’। দরজায় যিনি ছিলেন তার অনুরোধ আদেশ সমান। ওনার সঙ্গে উত্তম এলেন বাড়ির কাছে মিন্টো পার্কে। পার্কের বেঞ্চে বসে এক তাড়া কাগজ বের করে চিত্রনাট্য পড়তে শুরু করলেন মানুষটা। প্রায় অভিনয় করার মতো করে। ভোজবাজির মতো কোথা থেকে হাজির হয়ে গেল এক বোতল সস্তা মদ। টান টান স্ক্রিপ্ট, উত্তম মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছেন আর মানুষটা মদ গিলে চলেছেন অবিরাম কিন্তু পড়ে চলেছেন গড়গড় করে।

মুখ দিয়ে ভক ভক করে বেরোচ্ছে মদের গন্ধ। কিন্তু তাতে স্ক্রিপ্ট পড়া আটকাচ্ছে না, আর উত্তম পুরো মজে আছেন সেই অসামান্য চিত্রনাট্যে। ঘন্টা দেড়েক পর আর পারলেন না মানুষটা , কাগজের তাড়াটা পাঞ্জাবির পকেটে পুরে এলিয়ে পড়লেন বেঞ্চে। উত্তমের দ্রুত বললেন ‘দাদা, আমার কাঁধে ভর দিন আর চলুন আজ রাত্তিরটা আমার বাড়িতেই থেকে যাবেন’ বলে প্রায় বয়ে নিয়ে এলেন মানুষটাকে। নিয়ে এলেন মিন্টো পার্ক থেকে ময়রা স্ট্রিট। বাড়িতে সোফায় শুইয়ে দিলেন উত্তম। শোয়াতে গিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাগজগুলো বেরিয়ে এল। স্তম্ভিত হয়ে উত্তম দেখলেন সেগুলো এক দিস্তে সাদা কাগজ। কলমের কোনো আঁচড়ই নেই! এতক্ষন মানুষটা যে স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাচ্ছিলেন সেটা পুরোটাই ‘extempore’। ২৪ জুলাই, মহানায়কের মৃত্যুদিন। বাঙালি চমকে গিয়েছিল সেদিনের সেই খবর শুনে। অবিশ্বাস্য। এমনটাই হয়েছিল উত্তম কুমারের সঙ্গেও। মনে মনে হয়তো তিনি বলেছিলেন , ‘অবিশ্বাস্য’।

উত্তমকুমারের ফ্লপ মাস্টার থেকে চিরকালের মহানায়ক হয়ে ওঠার কাহিনী এক অনবদ্য গল্প,যেখানে ছত্রে-ছত্রে,রন্ধ্রে-রন্ধ্রে আছে এক সংগ্রামী তরুন শিল্পীর নায়ক হয়ে ওঠার লড়াই,ধাক্কা খাওয়া,হতাশাগ্রস্ত না হয়ে আবার চেষ্টা,পরিশেষে অধরা সাফল্য। যে কাহিনী বাঙালি জানেন,অনেকে পড়েন,আর সেই গল্প আমাদের শেখায় সাফল্যের কোনও শটকার্ট পদ্ধতি নেই৷ প্রতিভা যদি থাকে,সুযোগের অপেক্ষায় থাকতে হবে,নিজেকে উজাড় করে দিতে হবে,নিশ্চয়ই মিলবে সাফল্য৷ উত্তমকুমার অন্তত প্রমান করেছিলেন সাফল্যের শটকার্ট পদ্ধতি নেই,প্রতিভা থাকলেও বোধহয় প্রতিভার বিকাশ পরিবেশ-পরিস্থিতি হতে দেয়না,কিন্তু নিজের প্রতিভার প্রতি আত্মবিশ্বাস খোয়ানো আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ নয়৷ তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির সেন্তিমেন্ট। সেন্টিমেন্টে ধাক্কা লাগে ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই। বাঙালিকে এতটাই ধাক্কা দেয়, ২৪ জুলাই দিনটি বাঙালির কাছে হয়ে ওঠে এক চূড়ান্ত ট্র্যাজেডির দিন৷

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ