সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ভারতে ব্যবহার বাড়ছে চীনা কালো চালের। অবাক লাগলেও ঘটনা। চাল কালোও হয়। আবার তা চীনা জাত হলেও ভালোও হয়। চীনা দ্রব্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও এই চাল শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ভালো। ফলে ভারতের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও ক্রমে বাড়ছে কালো চাল চাষ এবং তার
ব্যবহার।

কালো চালের ইতিহাস অনেক পুরনো। চীনে চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকে মিং যুগে কালো চালের চাষ হতো। কিন্তু রাজা ও রাজ পরিবারের সদস্যরা ছাড়া আর কারো সেই কালো চালের ভাত মুখে তোলার অধিকার ছিল না। প্রজাদের জন্য এই চাল ছিল নিষিদ্ধ। সেজন্য এ চালকে বলা হক ‘নিষিদ্ধ চাল’ বা ‘ফরবিডন রাইস’।

পরে জাপান ও মায়ানমারে এই চালের চাষ শুরু হয়। সেখান থেকে এই চাল আসে বাংলাদেশে। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় চট্টগ্রামে এই চালের চাষ হত বলে গবেষকরা জেনেছেন। বর্তমানে পাহাড়ে জুমে এই চালের চাষ করা হয়। ভারতের মণিপুরেও এই চালের চাষ হয়।

সেখানে এই প্রজাতির চালের নাম ‘চাখাও আমুবি’ (Chakhao Amubi)। সম্পূর্ণ জৈবপদ্ধতিতে এবং বিশেষ কিছু অনুষ্ঠানে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও ওডিশায় আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে এই কালো চাল খাওয়ার প্রচলন হয়েছে। ওডিশা থেকে এখন পশ্চিমবঙ্গে খরিফ মরসুমে কালো চালের চাষ শুরু হয়েছে।

কালো চালের উপকারিতা প্রচুর। ‘অ্যান্টিঅক্রিডেন্ট ফ্লাভিনয়েড’ যা ‘অ্যানথোসায়ানিন’ নামে পরিচিত তা এই কালো চালে খুব বেশি পরিমাণে থাকাতেই চালের রঙ কালো হয়েছে। আর কালো চালে এ উপাদানটি থাকার কারণেই ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্নায়ূরোগ এমনকি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ প্রতিহত করতে পারে।

কালো চাল ক্যানসাররোধী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে পরিপূর্ণ। তাই বিশেষ করে ক্যানসার রোগ প্রতিরোধে কালো চাল অনন্য সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ধমনীতে রক্ত চলাচল যে সব কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, কালো চালের উপাদান তা হতে দেয় না। ফলে উচ্চ রক্তচাপ হয় না। ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়। এই চালে আয়রণ বেশি কিন্তু শর্করা কম। কালো চালে ক্যালোরির পরিমাণ ১৭০, ফ্যাট ১.৫ গ্রাম (৩%), কার্বোহাইড্রেট ১১%, আঁশ ৫%, ভিটামিন এ ২%, আয়রণ ৬%।

বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে, কালো চালের ভাত সাদা ভাতের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিযুক্ত, স্বাস্থ্যকর। এই চাল সাদা চালের মত নানা প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয় না বলে এর উপকারিতা অনেক বেশি পাওয়া যায় বলে মত গবেষকদের। এই চালে শর্করার পরিমাণ সাদা চালের চেয়ে কম, অন্যদিকে আঁশ ও ভিটামিন বি-এর পরিমাণ বেশি। ।

আদিবাসীদের কাছে এই চাল বিলাসী খাদ্য বা দামী চাল হিসেবে পরিচিত। চাকমা ও মারমারা এই চাল বেশি খায়। তাদের কাছে এই চাল ‘পোড়া বিন্নি’ নামে পরিচিত। থাইল্যান্ডেও এ চালের চাষ হয়। সে দেশে এই চালকে বলা হয় ‘কাও নাইও ডাহম’। ইংরেজীতে থাইল্যান্ডে এ চালকে বলা হয় ‘black sweet rice’, ‘black glutinous rice’, ‘Indonesian rice’। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায় এই চাল প্রাতঃরাশ হিসাবে খাওয়া হয়। তৈরি হয় পুডিংও।