মুম্বই: মহারাষ্ট্র-কর্ণাটক সীমান্ত থেকে ৬ কিলোমিটার দূরের ছোট্ট গ্রাম। লাটুর জেলায় এই হালগারা গ্রামকেই নিজের ঘর বলে মনে করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইঞ্জিনিয়ার দত্ত পাটিল। তিনি ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা ক্লারার বাসিন্দা। মোটা অঙ্কের বেতন পেলেও, হালগারার সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে দত্ত পালিতের। ঠিক যেন বাস্তবে স্বদেশ ছবির শাহরুখ অভিনীত চরিত্র মোহন ভার্গভ।

বিগত তিন বছর ধরে হালগারা গ্রামে জলস্তরের সীমা বাড়ানোর কাজ করছেন দত্ত পালিত। দ্য বেটার ইন্ডিয়া-র প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে হালগারা গ্রামেই দরিদ্র কৃষকের ঘরে জন্ম দত্তর। শৈশবে তিনি দেখেছেন, কী ভাবে তাঁর মা বাবা অতিরিক্ত কাজ করতেন শুধুমাত্র রোজকার খাওয়াদাওয়ার জন্য।

দত্ত বলছেন, আমার মা চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তিনি লেখাপড়া কিছুই জানেন না। কিন্তু মা সবসময়ে খেয়াল রাখতেন আমি ভালো বই পড়ছি কি না। মাঠে কাজ করার জন্য আমাদের কখনও স্কুল কামাই করতে দিতেন না। সবসময়ে জোর দিয়ে বলতেন, এই দারিদ্র থেকে বেরনোর একমাত্র পথ হল শিক্ষা। তিনি ভুল ছিলেন না।

তাই ছোট থেকেই মন দিয়ে পড়াশোনা করেছেন দত্ত। গ্রামের সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করে দশম শ্রেণিতে বোর্ড পরীক্ষায় গ্রাম থেকে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। এর পরে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করে ১২ রাংক পান তিনি। এর পরেই কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শুরু দত্তর। কিন্তু সেই সময়ে ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কোনও ধারণাই ছিল না তাঁর।

তিনি বলছেন, শিক্ষকরা যেদিন প্রথম কম্পিউটার লগইন করতে বলেছিলেন, সেদিন কিছুই বুঝতে পারিনি। আমায় কেউ কোনওদিন এগুলি শেখায়নি। গ্রামে এসব কম থাকে। শহরের সব উজ্জ্বল পড়ুয়ারা আমার সহপাঠী ছিল। আর আমি স্থানীয় স্কুল থেকে পড়েছিলাম। ইংরেজিও ঠিক করে বলতে পারতাম না। সমস্যা হয়েছিল সেই সময়ে।

কিন্তু সেই সমস্যাও অতিক্রম করতে দত্তর বেশি সময় লাগেনি। এর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান তিনি। কিন্তু তাও নিজের গোড়ার অস্তিত্ব তিনি ভুলে যাননি। তাই প্রতি বছরে একবার দেশে আসেন তিনি। পরিবারকে নিয়ে তীর্থযাত্রায় যান। এমনকী, গ্রামের খরা নিয়েও বেশ চিন্তিত ছিলেন তিনি। প্রায়ই খবরের কাগজে পড়তেন কী ভাবে খরার জেরে কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

এর পরে ক্যালিফর্নিয়া থেকেই হালগারার বার্ষিক বৃষ্টি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। ক্যালিফোর্নিয়াও খুবই রুক্ষ এলাকা। তাই সেখানকার মডেল দেখেই হালগারার জন্য চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন দত্ত পালিত। টানা পাঁচ বছর ক্যালিফর্নিয়ায় খরা হয়েছিল। তখন সেখানে বার্ষিক বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৪০০ মিমি। অন্যদিকে হালগারার পরিমাণ ৮০০ মিমি। কিন্তু তাও কেন খরার মুখে পড়তে হচ্ছে হালগারাকে, এই চিন্তাই ভাবাচ্ছিল ইঞ্জিনিয়ারকে।

বহু গবেষণার পরে তিনি দেখলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় জলস্তর ৭০ ফুট নীচে আর হালগারায় ৮০০ ফুট নীচে। এরপরে নিজের পকেট থেকেই ৩ লক্ষ টাকা খরচ করে কাজ শুরু করলেন। তাঁর মূল লক্ষ্যই ছিল বৃষ্টির প্রতি ফোটাকে সংরক্ষণ করে রাখা। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। পুরো কর্মকাণ্ডের জেরে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইঞ্জিনিয়ার ২০০ কোটি লিটার জল সংরক্ষণ করতে পেরেছেন। আর পুরোচা কাজটির জন্য নিজের পকেট থেকে খরচ করেছেন ২২ লক্ষ টাকা।