নিখিলেশ রায়চৌধুরীঃ  কিছু দিন আগে সৌদি আরবের সেনাবাহিনীতে বড়সড় পরিবর্তন ঘটেছে৷ সেখানে সামরিক বাহিনীর মাথায় যাঁরা বসেছেন তাঁদের মধ্যে একজন সেদেশের টেলিকম কোম্পানির হর্তাকর্তা৷ প্রায় একই সময়ে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু-র বিরুদ্ধে সেখানকার টেলি যোগাযোগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷ ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে কাকতালীয় মনে হলেও বোধহয় তা নয়৷

নেতানইয়াহু-র নেতৃত্বেই ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের সন্ত্রাস নির্মূল কর্মসূচির ক্ষেত্রে একটা বড়সড় সমঝোতা হয়েছে৷ ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর সঙ্গে ইজরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রযুক্তিগত আদানপ্রদান যাতে আরও বাড়ে সেই লক্ষ্যেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে৷ এই নেতানইয়াহু-র ভাই এক সময় ইদি আমিনের উগান্ডায় একটি অসাধারণ কমান্ডো অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন৷ এবং সেই অপারেশন চালানোর সময় তিনি প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছিলেন৷ ‘অপারেশন থান্ডারবল’ নামের ওই কমান্ডো অভিযানের লক্ষ্য ছিল আরব জঙ্গিদের কবল থেকে নিরীহ বিমানযাত্রীদের বাঁচানো৷

ইজরায়েল গণতান্ত্রিক দেশ৷ এর আগেও সেখানে নির্বাচিত নেতারা একাধিকবার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন৷ সুতরাং, নেতানইয়াহু-র বিরুদ্ধেও এই ধরনের অভিযোগ ওঠা অভাবনীয় নয়৷ এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷ কিন্তু এবার দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে উঠল এমন একটা সময়ে এবং তায় আবার টেলি যোগাযোগ নিয়ে যখন একদিকে ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের গোয়েন্দা বাহিনীর প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আগের চাইতে মজবুত হয়েছে, আর অন্যদিকে সৌদি আরবের সামরিক ক্ষমতায় বসেছেন সেখানকার টেলিকমিউনিকেশনের মালিক৷

সৌদি আরবের নিজস্ব সামরিক শক্তি বলতে তেমন কিছু নেই৷ বরং, সেদিক থেকে তাদের এক রকম প্রতিবন্ধীই বলা চলে৷ মূলত আমেরিকার সামরিক শক্তির দয়াতেই তারা রাজত্ব করছে৷ উলটো দিকে ইজরায়েল তার একান্ত নিজস্ব সামরিক এবং তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষমতায় বলীয়ান৷ তার উপর পরমাণু শক্তিতেও সে নিজেকে অনেক দিন আগেই মজবুত করেছে৷

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে নেমেছেন তাতে তাঁর মনে রাখা উচিত, সন্ত্রাসবাদের মূলোৎপাটন করতে হলে তাঁদের অনেক দূর এগতে হবে৷ শুধু পাকিস্তানকে নিয়েই পড়ে থাকলে চলবে না৷ পাকিস্তানের মতো দেশকে যারা বিভিন্ন খাতে ঢালাও অর্থসাহায্য জোগাচ্ছে তাদেরও সময়মতো চেপে ধরতে হবে৷

সব নীতিই যদি পরিচালিত হয় স্রেফ নিজের স্বার্থে, তাহলে কিন্তু তার কুফল শেষ পর্যন্ত নিজেকেই ভুগতে হয়৷ ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে আত্মঘাতী বিমান হামলাতেই যেটা সেদেশের প্রশাসনকে ভুগতে হয়েছিল৷ তার পরেও যদি সেই একই ব্যাপার চলতে থাকে, তাহলে কিন্তু তার ধাক্কা আবার আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলিকেই বারংবার ভুগতে হবে৷

সন্ত্রাস নির্মূলের উদ্দেশ্যে ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের জন্য আমেরিকার প্রশাসনের চিন্তিত হওয়ার কোনও কারণ থাকতে পারে না৷ কিন্তু তাদের ভেবে দেখা উচিত ছিল, কেন সৌদি আরবে সামরিক রদবদলের সময়েই ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠল৷ বিশেষ করে যে প্রধানমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে আগের চাইতে আরও বেশি নির্ভরযোগ্য করে তুলতে চাইছেন৷ ভারতের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্কের কথা জেনেও৷

বাণিজ্যগত কারণে, বিশেষ করে তেলের জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে আমেরিকা ও ব্রিটেন উভয়েরই খুব খাতিরের সম্পর্ক৷ কিন্তু সেই খাতিরের চোটে যদি সন্ত্রাসবাদ নামক আপদটিকে খতম করা না যায়, তাহলে সেই খাতির রেখে লাভ কী?

একটা সময় স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি হিসাবে আমেরিকার কাছে পাকিস্তানের বিশেষ মূল্য ছিল৷ কিন্তু এখন ভারতের সঙ্গে আমেরিকার যা সম্পর্ক সেদিক থেকে দেখলে, আলাদাভাবে পাকিস্তানকে তাদের তোল্লাই দেওয়ার কোনও দরকার নেই৷ এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানকে চেপে ধরার জন্য উদগ্রীব৷ অথচ, সেই পাকিস্তানকে তথা কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদকে জিইয়ে রাখছে যে সৌদি আরব সহ অন্যান্য শেখশাহি তাদের বিরুদ্ধে তিনি কোনও কড়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন না৷

ইজরায়েল এবং ভারত, উভয় দেশই নিজের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে বাঁচতে জানে৷ তার উপর উভয় দেশই পরমাণু শক্তিতে বলীয়ান৷ সেইসঙ্গে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির দিক থেকেও তারা স্বনির্ভর৷ উপরন্তু আজ পর্যন্ত দুই দেশই যেচে কারও সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহে জড়ায়নি৷ এখন সন্ত্রাসবাদ দমনের উদ্দেশ্যে সেই দুটি দেশ যখন পরস্পরের অনেক কাছাকাছি এল, ঠিক তার পরেই ইজরায়েলের ভারতবন্ধু প্রধানমন্ত্রী নেতানইয়াহু দুর্নীতির কবলে পড়লেন আর সৌদি আরবেও ঘটে গেল ‘ঐতিহাসিক’ সামরিক রদবদল– ব্যাপারটা কী রকম যেন ঠেকছে!

সৌদি আরবের সামরিক ক্ষমতায় এলেন এমন একজন সেনা অফিসার যিনি সেখানকার শেখশাহির হয়ে টেলিকমিউনিকেশনের কাজ-কারবার দেখেন৷ আর ওদিকে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানইয়াহুকে জড়িয়ে পড়তে হল টেলিকমিউনিকেশন সংক্রান্ত দুর্নীতিতেই৷ এহেন সমাপতনে খটকা লাগে৷

আশা করা যায়, সন্ত্রাস দমনের খাতিরে আগামী দিনেও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর বন্ধুত্বমূলক স্বচ্ছ সম্পর্ক বজায় থাকবে৷ ঠিক যেমন রয়েছে অন্যান্য সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী দেশের সঙ্গে৷ অন্তত সেইসব দেশের সঙ্গে যারা সন্ত্রাসবাদীদের ক্ষেত্রে ভালো জঙ্গি-মন্দ জঙ্গি বলে কোনও আলাদা আলাদা সংজ্ঞা বাছে না৷ পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যেটা হরদম করে থাকে৷ তাদের চোখে ভারত-বিরোধী কাবুল-বিরোধী মুসলিম সন্ত্রাসবাদীরা ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’, আর পেশোয়ারের সেনাস্কুলে হামলাকারী ফিদায়েঁরা ‘কালো তালিকাভুক্ত জঙ্গি’৷