সুপর্ণা সিনহা রায়, শিকাগো: কলকাতা যদি মহালয়া কিমবা চতুর্থী থেকেই পুজো শুরু করে দিতে পারে তাহলে মন খারাপ হয়না? এমনিতেই বিদেশে থাকা৷ তারপর বছরের সবথেকে বড় পুজোটার স্বাদ যদি সঠিক সময়ে নেওয়া না গেল তাহলে মন খারাপ তো হবেই৷ সেই ভেবেই আর পাঁচটা দেশের মত কলকাতায় মা দুর্গার বিসর্জনের পর পুজো শুরু করতে চান না শিকাগোর বাঙালিরা৷

তাই ১২,১৩,১৪ অক্টোবরেই দুর্গা পুজো করলেন শিকাগোর বাঙালিরা৷ এটাই নিয়ম শিকাগোর৷ আগের উইকেন্ডে শুরু করা হয় পুজো৷ এমনিতেই কাজের দিন ছেড়ে সপ্তাহান্তে পুজো করতে হয়৷ বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ গ্রেটার শিকাগো এবছরও সেই একই নিয়মে পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে বার্টলেট হাই স্কুলে৷

এবার আসা যাক শিকাগোর পুজো শুরুর গোড়ার কথায়৷ শিকাগোতে পুজো শুরু হয় ১৯৭০ সালে৷ সে সময় কলকাতা থেকে ঠাকুর নিয়ে যাওয়া হত না৷ প্রতিমা তৈরি হত শিকাগোতেই৷ যাঁরা পুজো শুরু করেন এখন তাঁদের বয়স ৮০র কোঠায়৷ সেসময় তাঁরাই দায়িত্ব নিয়ে পুজো শুরু করেন৷ সেসময় পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাত্র ৫০ থেকে ৬০ জন৷ এখন ১২০০ থেকে ১৩০০ মানুষ আসেন শিকাগোর পুজো দেখতে৷ ২০১৮ এর দুর্গা পুজোর প্রেসিডেন্ট অমিত চক্রবর্তী জানান, “বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ গ্রেটার শিকাগো আমাদের বহু পুরনো একটি সংস্থা৷ সত্তরের দশকের শেষের দিকে BAGC-র কাজ শুরু হয়৷ আমাদের সংস্থার উদ্দেশ্য পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা৷ বিশেষ করে বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনযাপন৷”

শঙ্কর সরকার শিকাগোর প্রবীণ নাগরিক৷ এর আগে শিকাগোর পুজোর প্রেসিডেন্টও ছিলেন তিনি৷ জানান “বহু বছর হল কলকাতা ছেড়েছি৷ বাবা এখনও বেঁচে তাই যাই কলকাতা৷ কিন্তু কলকাতার দুর্গা পুজো আর অত টানেনা৷ কোথায় যেন শিকড়টা ছিঁড়ে গিয়েছে৷ এখানে এত ভাল ভাবে পুজো করা হয় আর আমরা এতটাই একত্র হয়ে পুজো করি যে কলকাতায় না থাকাটা তেমন দুঃখ দেয়না৷ আর নতুন প্রজন্মের যারা এই পুজোর দায়িত্ব নিচ্ছে তারা এত বছরের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে৷”

নিয়ম মেনে মহালয়ার অনুষ্ঠানও করা হয়৷ এখন কলকাতায় থিম পুজোর প্রচলন শুরু হয়ে গেলেও এত বছরের শিকাগোর পুজোর ঐতিহ্যে টান জন্মে গিয়েছে সকলের৷ শিকাগোর পুজো স্পেশাল কারণ এখানের পুজো এখনও ভেঙে বেরোয়নি৷ সেই প্রথমে যা ছিল আজও একই আছে৷ বরং মানুষ বেড়েছেন কিন্তু একাত্মবোধ এবং নিজস্বতা রয়েছে যার জন্য এখনও ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে৷ যেটা তাঁদের কাছে গর্বের বিষয়৷ এদেশ থেকে শিল্পীদের নিয়ে যাওয়া হয় অবশ্যই কিন্তু শিকাগোয় থাকা বাঙালিদের নিজস্ব অনুষ্ঠান অনেক বেশি ভাল হয় বলেই মনে করেন তাঁরা৷

ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরিও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন৷ তিনি জানান, “শিকাগোতে বহু বছর ধরে একটাই পুজো করে আসছি৷ এটাই আমাদের ঐতিহ্য৷ নর্থ আমেরিকাতে প্রচুর শহরে অনেকগুলো পুজো হয়েছে কিন্তু আমাদের শিকাগোয় প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে একটিই পুজো হচ্ছে৷ প্রবীণ প্রজন্ম নবীনদের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন এবং আমরা সকলে মিলে সেটাই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি৷”

তিন দিন ধরে হয় পুজো৷ পুজোকে ঘিরে চলতে থাকে নানা অনুষ্ঠান৷ সঙ্গে খাওয়াদাওয়া৷ অষ্টমীতে খিচুরি বাঁধাকপির তরকারি চাটনি পাঁপড় যেমন ছিল তেমনই ছিল এগ চিকেন রোল পনির টিক্কা রোল ফ্রাইড রাইস, ফ্রাইড চিকেন চিলি চিকেন, ফিস অমৃতসরি, মাটন কষা, ভেজ মাঞ্চুরিয়ান৷ আরও কতকি! শেষ পাতে কোনওদিন রসমালাই, মিষ্টি দই তো কোনওদিন মিল্ক কেক, মালাই পিস্তা চমচম৷ এতকিছুর সঙ্গে উপরি পাওনা সকলের চাকরি আর ব্যস্ত সময়ের মাঝে কয়েকটা দিন একসঙ্গে কাটানো৷ হাসি ঠাট্টা আনন্দ৷

এই পুজো ছেড়ে কলকাতায় ফিরতে চান না অনেকেই৷ সেই শিকড়টা ছিঁড়ে গিয়েছে৷ তবে শিকড় নতুন করে গজিয়েছে শিকাগোর পুজোকে ঘিরে৷ তা বছরের পর আরও শক্ত হয়ে ছড়িয়েছে৷ জমি যেমন শক্ত হয়েছে মাটির তলার বাঁধনও হয়েছে পুরু৷ মহীরুহে পরিণত হয়েছে মনোবল৷ অনেক বেশি ইউনাইটেড হয়েছে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অফ গ্রেটার শিকাগোর দুর্গা পুজো৷