স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: অঘোরী তন্ত্র, তন্ত্র সাধনা ছিল সে যুগেও, রয়েছে একালেও৷ রয়েছে খোদ কলকাতার বুকে৷ সকলের অগোচরে বছরের পর বছর ধরে তন্ত্রবিদ্যার চর্চা হয়ে আসছে একুশ শতকেও৷

কলকাতার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র শ্যামবাজার৷ এখান থেকে কিছু দূরে, বেলগাছিয়ার দক্ষিণদ্বারীর রেল কোয়ার্টার এলাকায়৷ আরও স্পষ্ট করে বললে দত্তবাগান মিল্ক কলোনির গেট থেকে হাঁটাপথে দশ-বারো মিনিট গেলেই পাওয়া যাবে কলকাতার বুকে তন্ত্র সাধনার অন্যতম স্থান ‘তারাশঙ্করী পীঠ’৷

বৈদিক নয়, তন্ত্রমতে রোজ কালী পুজো হয় এখানে৷ নির্দিষ্ট করে মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় জানতে না পারলেও, শোনা যায় প্রায় ৬৫ বছর আগে যোগীরাজ পরেশচন্দ্র রায়মৌলিক ও তাঁর স্ত্রী অঞ্জলি রায় মৌলিক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই মন্দির৷ তন্ত্র সাধক দম্পতির পরলোক গমনের পরে মন্দিরের বর্তমান সেবায়েত তাদের দুই ছেলে তারানন্দ ব্রহ্মচারী ও পার্থ রায় মৌলিক৷

উগ্রচণ্ডা,প্রচন্ডা মায়ের এক দেহে রয়েছে তিন রূপ- ‘এক জটা, নীল সরস্বতী ও অকব্য ভৈরব’৷ মায়ের সামনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের খুলি, হাড়, কঙ্কাল ইত্যাদি৷ মন্দিরের বর্তমান সেবায়েতদের দাবি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে একমাত্র তারাশঙ্করী পীঠেই রয়েছে- ‘নবমুন্ডী আসন’৷

কী এই নবমুন্ডী আসন? পার্থ রায় মৌলিক জানালেন, ‘‘মানুষ সহ নটি প্রাণীর মুণ্ড বা মাথা রয়েছে এই আসনের তলায়৷ এর উপর বসেই তাঁদের বাবা তথা, যোগীরাজ পরেশচন্দ্র রায়মৌলিক মায়ের নামে তন্ত্র সাধনা করতেন৷’’

মন্দিরের গর্ভগৃহে, দেবীর সামনে সর্বদা জ্বলছে একটি অগ্নি কুন্ড৷ জানা যায়, শ্মশানের চিতা থেকে জ্বলন্ত কাঠ এনে ৬৫ বছর আগে এই অগ্নি কুণ্ড জ্বালিয়ে ছিলেন যোগীরাজ৷ সেই আগুন এখন জ্বলছে! উত্তর কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশান থেকে আসে আধ পোড়া কাঠ৷ সেই কাঠেই জ্বলে অগ্নি কুন্ড৷

পার্থ রায় মৌলিক জানালেন, ‘‘ আজও নেভেনি এই অগ্নি কুণ্ডের আগুন৷ যদি কোন দিন নিভে যায় তবে তাদের বাবার দেওয়া বিধান অনুযায়ী সধবা স্ত্রীর চিতার আগুন এনে পুনরায় জ্বালাতে হবে এই আগুন৷’’ কালী পুজোর দিন এই অগ্নি কুণ্ডের আগুন দিয়েই দেবীর যজ্ঞ করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি৷

নিত্য পুজোর পাশাপাশি, কালী পুজোর দিন অন্য সাজে সেজে ওঠে মন্দির চত্বর৷ নিয়ম করে কুমারী পুজো, চণ্ডীপাঠ চলে৷ সারা রাত ধরে ভোর পর্যন্ত চলে মায়ের আরাধনা৷ মন্দিরে আগে রাজহাঁস, মহিষ ও ছাগ বলি দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও, এখন কেবলমাত্র ছাগ বলি দেওয়া হয়৷ প্রসাদে মা-কে নিবেদন করা হয় অন্ন ভোগ, সবজি, ভাজা, পায়েস ও পাঁচ রকমের মাছ৷

কেবল মা কালী নয়, বারো বিঘা জমির মন্দিরে রয়েছেন যশমাধব রূপে বিষ্ণু ও কাল ভৈরব৷ মন্দিরে আসা এক ভক্ত জানিয়েছেন, কালী পুজোর দিন গর্ভ গৃহে ঢোকার নির্দেশ থাকে না কারও৷ সেখানে একান্তে মায়ের আরাধনা করেন তারানন্দ ব্রহ্মচারী মহারাজ৷ মন্দিরের বাইরে আলাদা স্থানে চলে সম্পূর্ণ পূজার্চনা৷