সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: জার্মানির খ্যাতি ফুটবলের জন্য। সে দেশের বিশ্বজোড়া খ্যাতি রয়েছে চার চাকা গাড়ি তৈরির জন্য। বড় ভারি শিল্প বলতেই জার্মানি৷ কিন্তু সূক্ষ্ম কারুকার্যেও তারা চমকে দেয়৷ যেমনটা করেছিল দেবী লক্ষ্মীকে নিয়েও৷ পোর্সেলিনের তৈরি সেই শিল্প এখন অবলুপ্ত৷ সেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পের কিছু নিদর্শন সংগ্রহে রেখেছেন অপূর্ব কুমার পাণ্ডা।

সরকারি চাকুরে অপূর্ববাবুর পুরনো জিনিসপত্র সংগ্রহের বাতিক রয়েছে। কোনও অ্যান্টিক জিনিস চোখে পড়লেই তা সংগ্রহ করে নেন। সেই সংগ্রহের তালিকাতেই রয়েছে ‘জার্মান লক্ষ্মী’। অভিনব তার দেখনদারি৷

অপূর্ববাবু জানিয়েছেন, উনবিংশ শতকের শেষের দিক। ভারতে আসতে শুরু করে জার্মানিতে তৈরি পোর্সেলিনের দেবদেবীর পুতুল। যদিও এর অনেক আগে থেকেই ভারতে পোর্সেলিনের পুতুল আসত। জার্মানরা জোড় দিল দেবদেবীর আদলে। সেই সময়েই জার্মানি থেকে আসা শুরু হয় পোর্সেলিনের তৈরি লক্ষ্মীও।

এহেন জার্মান লক্ষ্মীর একটি সংগ্রহ করে রেখেছেন অপূর্ব পাণ্ডা। তাঁর সংগ্রহশালার নাম ‘তারার ছায়ায়’। তিনি বলেন, “উনিশ শতকের শেষের দিকে রবি বর্মার ছবি আঁকা জার্মানিতে যাওয়া শুরু করে। দেব দেবীর আঁকা ছবি দেখে সে দেশের শিল্পীরা ওই ছবির অনুকরণে ভারতীয় দেব দেবীর পোর্সেলিনের মূর্তি বানাতে শুরু করেন। সেই মূর্তি ক্রমে খ্যাতি লাভ করে বাংলার বাজারে।” অপূর্ববাবু বলেন, “এইসব মূর্তির কারিগর কারা তা সব মূর্তিতে থাকত না। তবে জার্মান বিশেষ কোড রয়েছে সেগুলি দেখে বোঝা যেতে পারে এগুলির সে দেশে তৈরি।” জার্মানিতে তৈরি লক্ষ্মীর পাশাপাশি গণেশ, শিব, দুর্গা সবই আসত ভারতে। এমন প্রায় ২৫০টি মূর্তি সংগ্রহে রয়েছে অপূর্ববাবুর।

জার্মান পোর্সেলিনের মূর্তির প্রচুর দাম হত। জার্মানির দেখাদেখি পরে জাপানি শিল্পীরা ভারতীয় দেবদেবীর পোর্সেলিনের মূর্তি বানাতে শুরু করে। সে সব স্থান পেতে থাকে মধ্যবিত্তের ঘরেও। অপূর্ববাবু বলেন, “উচ্চবিত্তরা নকল করতেন ইংরেজদের। মধ্যবিত্তরা নকল করার চেষ্টা করতেন বিত্তবানদের। জাপানী মূর্তির দাম তুলনায় অনেক কম। এর জন্যই পোর্সেলিনের মেড ইন জাপান ভারতের দেবদেবী মূর্তি বাংলা সহ সমগ্র ভারতে খ্যাতি লাভ করে। সোজা কথায় দুধের সাধ যদি ঘোলে মেটানো যায় সেই চেষ্টা।” জার্মান ও জার্মান পুতুলের মূল পার্থক্য ছিল রঙে। জার্মান রঙ যতটা টেকসই হত ভারতীয় আবহাওয়ায় খাপ খেত না জাপানী পুতুলের রঙ।

অন্যদিকে জানা যায় বাংলায় সেই সময় খ্যাতি সম্পন্ন ছিল কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল। সে পুতুলের রঙ উঠে যেত। ভেঙে যেত তাড়াতাড়ি। কিন্তু জাপানী পোর্সেলিনের দেব দেবীর পুতুল রঙ কৃষ্ণনগরের থেকে বেশী দিন থাকত। খুব সহজে ভেঙে যেত না। সেই জন্য বাংলাতেও পোর্সেলিনের দেব দেবীর পুতুল খ্যাতি লাভ করে। অপূর্ববাবু বলেন, “উনিশ শতকের শেষের দিকে তখনও বাল্যবিবাহের রীতি ছিল। ছোট্ট মেয়ের পুতুল খেলার বয়স। তাই বিয়েতে এই পোর্সেলিনের দেব দেবীর পুতুল দেওয়া হত। মেয়ের খেলাও হল আবার উপহারও দেওয়া হয়ে গেল।”

নজর কেড়েছিল এই বিদেশী লক্ষ্মী ও দেব দেবীরা৷ কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেসবও হারিয়ে গিয়েছে৷

আর বছর খানেক পরেই চাকরি থেকে অবসর সময় চলে আসবে অপূর্ববাবুর। বললেন, “পাগলামিটা আরও একটু বাড়িয়ে দেব। অফিসের জন্য ভালো করে কাজ করতে পারি না। পোর্সেলিনের পুতুল নিয়ে আরও কিছু জানার ইচ্ছা রয়েছে।” তাঁর এমন সংগ্রহ বাতিকের ভবিষ্যৎ? বললেন, “জানি না। ভালো লাগে করে যাই। অজানা অচেনা কারোর ভবিষ্যতে কাজে লাগতেই পারে।”