প্রসেনজিৎ চৌধুরী: পাক রেলের তথ্যে ধরা রয়েছে অভিনব কথা। সেটা অবশ্য ভারত বিভাগের অনেক আগেকার বিষয়। মোটামুটি যা হিসেব মিলছে তাতে স্পষ্ট ১৮৮১ সালে তৈরি একটি স্টেশনে এখনো শতাব্দী প্রাচীন চা পানের উপযোগিতা নিয়ে বাংলা-হিন্দি-উর্দুতে পোস্টার জ্বল জ্বল করছে।

গোলরা শরিফ আধুনিক পাক রেলের একটি রেল মিউজিয়ম এবং গুরুত্বপূর্ণ রেল জংশন। ইসলামাবাদ সংলগ্ন এই এলাকা থেকে পেশোয়ার, কোহাটের মতো সীমান্ত এলাকার ট্রেন যান। আবার মুলতানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গেও যোগাযোগ।

ভাবা যাক সময় সারণী বেয়ে আপনি পৌঁছে গিয়েছেন ভারত বিভাগের ঠিক কিছু আগের বছরে। চরম জাতিগত সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। চারিদিকে চাপা আতঙ্ক। হিন্দু, শিখরা দলে দলে তাঁদের পৈত্রিক ভিটে মাটি ছেড়ে ভারতের দিকে পাড়ি জমাচ্ছেন। আর মুসলিমরা আসছেন পাকিস্তানের দিকে।

এই সেই গোলরা শরিফ স্টেশন। এখান থেকেই শয়ে শয়ে মানুষ ট্রেন বদলে জীবনের ঝুঁকিয়ে ভারতে আসতেন। কেউ পারতেন কেউ পারতেন না। ভারত বিভাগের চরম রক্তাক্ত পরিস্থিতির শিকার হয়ে কতজনের মৃত্যু হয়েছে এই যাত্রাপথে তার সঠিক হিসেব নেই।

সেই সব কঠিন দিনের যাত্রায় আর পাঁচটা স্টেশনের মতো গোলরা শরিফ ছিল জমজমাট। চা-এ গরমমমমমম, চা-এ গরমমমমম ডাক শোনা যেত। যাত্রীরা খেতেন। স্টেশনের পুরনো বটগাছের গুঁড়িতে দেওয়া হয়েছিল চা পান সংক্রান্ত পোস্টার। এখনও জ্বলজ্বল করছে সেটা। তাতে দেখা যায় বাংলায় লেখা চা পান করার উপকারিতা।
পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পরেও তার একটি অংশ ছিল বাংলাভাষীদের জন্য-পূর্ব পাকিস্তান। পরে প্রবল রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর সেই অংশ স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশে তৈরি হয়। চরম বাংলা বিদ্বেষী তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের লাল চোখ এড়িয়ে কী করে যেন গোলরা শরিফের সেই চা পানের বাংলা পোস্টারটি টিকে গিয়েছিল।

আধুনিক পাক সরকার দেশের রেল ইতিহাসের পুরনো তথ্যে গোলরা শরিফের এই মজার পোস্টারটি সংরক্ষণ করেছেন। ১৯১২ সালে এটি জংশন মর্যাদা পায়। ২০০৩ সালে স্টেশনটি মিউজিয়ম করার পর বেড়েছে পর্যটকদের আগমন। ছবির মতো সুন্দর এলাকা। পুরনো ব্রিটিশ স্থাপত্যে মোড়া গোলরা শরিফ।রাজধানী শহর ইসলামাবাদের কাছেই এই স্টেশন। পাক রেল জানাচ্ছে, দিনভর মডেল স্টেশনটি ও তার পুরনো রেল সরঞ্জাম দেখতে অনেকে আসছেন। কিন্তু সবার নজর পড়ে সেই বিখ্যাত চা পানের পোস্টারে। যেখানে জ্বল-জ্বল করছে তিনটি ভাষা। আধুনিক পাকিস্তান ধরে রাখছে তার অতীত কথা।