সুমন বটব্যাল ও মানব গুহ, পাঁশকুড়া: ফের আদালতের কাছে মুখ পুড়ল রাজ্যের৷ একই সঙ্গে আদালতের এদিনের নির্দেশের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রাক্তন’ বাইক-চালক আনিসুর রহমানের হাত ধরে এই প্রথম নজিরবিহীনভাবে রাজ্যের কোনও পুরসভার দখল নিতে চলেছে বিজেপি৷ তাও আবার, পূর্ব মেদিনীপুরের মতো খাস ‘অধিকারী’ গড়ে! স্বভাবতই, রাজ্য রাজনীতিতে জোর চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে৷

পাঁশকুড়া পুরসভার পরিচালনাভার কার দায়িত্বে থাকবে, এই সংক্রান্ত মামলায় বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সুব্রত তালুকদার রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে আনিসুর রহমানকেই পাঁশকুড়া পুরসভার চেয়ারম্যান পদে বহাল রাখার নির্দেশ জারি করেছে৷ স্বভাবতই, উচ্ছ্বসিত বিজেপি শিবির৷ টেলিফোনে প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় মুকুল রায় ঘনিষ্ট আনিসুর বলেছেন, ‘‘আদালতের রায়কে স্বাগত৷ এই জয় পাঁশকুড়ার মানুষের জয়, গণতন্ত্রের জয়৷’’ ঘনিষ্ঠ মহলে আনিসুরের দাবি, ‘পাঁশকুড়া পুরসভার ১৬জন তৃণমূল কাউন্সিলরের মধ্যে সিংহভাগই তাঁর সঙ্গে রয়েছেন৷ ফলে আগামী সাতদিনের মধ্যে বিজেপির নেতৃত্বে তিনি ফের পুরসভার নিজের সংখ্যা গরিষ্ঠতা প্রমাণ করবেন৷’’

১৮টি আসন বিশিষ্ট পাঁশকুড়া পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূল ১৭ ও বিজেপি ১টি আসনে জয়ী হয়৷ সূত্রের খবর, দলের একাংশ নন্দ মিশ্রকে চেয়ারম্যান করতে চাইলেও দলের গাইড লাইনের বাইরে গিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর জেলাশাসকের দফতরে ভোটাভুটির মাধ্যমে ১০-০৭ ভোটে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হন আনিসুর৷ তাঁর অভিযোগ, ‘‘চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরও মহকুমা শাসক ও জেলাশাসক সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে আমাকে দায়িত্বভার দিচ্ছিলেন না৷ আবার ইস্তফা দিতে চাইলে তা গ্রহণও করছিলেন না৷ বাধ্য হয়েই ৬ অক্টোবর এক্সিকিউটিভ অফিসারের কাছে চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিই৷’’
এরপরই গত ২৩ নভেম্বর রাজ্য সরকারের তরফে মুখ্যসচিব এক নির্দেশিকায় আনিসুরকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারিত করে ‘কেয়ারটেকার চেয়ারম্যান’ পদে নন্দ মিশ্রকে দায়িত্বগ্রহণের নির্দেশ দেয়৷ সেই নির্দেশের কপি দেওয়া হয়নি আনিসুরকে৷

রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আনিসুর সহ তৃণমূলের পাঁশকুড়া পুরসভার ৬জন কাউন্সিলর কলকাতা হাইকোর্টে মামলা রুজু করে৷ তারই ভিত্তিতে এদিন আদালত স্পষ্টভাবে রাজ্য সরকারের ওই নির্দেশিকাকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে পুরসভার চেয়ারম্যান পদে ফের আনিসুরকেই বহাল করার নির্দেশ জারি করেছে৷

ডিসেম্বরের গোড়াতেই সবংয়ের মাটি থেকে গেরুয়া জার্সি গায়ে চড়িয়েছিলেন মুকুল ঘনিষ্ঠ তরুণ-তুর্কি আনিসুর৷ সেদিন স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ‘‘যে লক্ষ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি৷ তাই পরিবর্তনের পরিবতর্ন কায়েম করতেই বিজেপিতে যোগদান৷’’ আর এদিন হাইকোর্টের রায়ের পর আনিসুর বলেন, ‘‘পাঁশকু়ড়া থেকেই সারা জেলায় পদ্ম ফোটানোর সংকল্প বাস্তবায়িত করব৷’’

নন্দীগ্রামে সিপিএমের গণহত্যার প্রতিবাদে ডিওয়াইএফআইয়ের জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য আনিসুর দলত্যাগ করে তৃণমূলে যোগ দেন৷ সেটা ২০০৭ সালের ১৬ মার্চ৷ তার দু’দিন আগেই নন্দীগ্রামে তৎকালীন শাসকের ক্যাডার ও পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন নন্দীগ্রামের চোদ্দো জন নিরীহ গ্রামবাসী৷ ১৬ মার্চ পুলিশ ও তৎকালীন শাসকের ক্যাডার জেলাকে অবরুদ্ধ করে রাখলেও সকলের চোখে ধুলো দিয়ে পাঁশকুড়া থেকে মাঠের আলপথ ধরে বাইকে চড়িয়ে দলনেত্রীকে তমলুক জেলা হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিলেন এই আনিসুরই৷ তখন থেকে পূর্ব মেদিনীপুরে দিদিমণির ছায়াসঙ্গী ছিলেন আনিসুর৷ দলের অন্দরে তাঁর পরিচয় ছিল- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পার্সোনাল বাইক-চালক’ হিসেবে৷

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ১০ বছরের ব্যবধানে সেই আনিসুরই দল বদলে শাসক বিরোধী লড়াইয়ে স্বীকৃতি পেলেন স্বয়ং আদালত থেকেই৷ তবে কি এটা শেষের শুরুর ইঙ্গিত? জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে৷