সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : মদের দোকানে বয়ের কাজ করা ছেলেই হয়ে গেলেন সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার হিরো। নিজের জীবনে এসব ঘটছে এসব অবিশ্বাস্য মনে হতো বিখ্যাত অভিনেতার কাছে। এক হলিউডের পরিচালক তাঁর অভিনয় দেখে চ্যাপলিনের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অথচ যাঁর সম্বন্ধে তিনি এমন ভাবছেন তিনি নিজে চ্যাপলিন সম্বন্ধে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি তুলসী চক্রবর্তী। তাঁর প্রয়াণ দিবসে বিশেষ প্রতিবেদন।

কৃষ্ণনগরেরর গোয়ারীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আশুতোষ চক্রবর্তীর অকালমৃত্যুর পর তুলসী অল্প বয়সে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে জ্যাঠামশাই প্রসাদ চক্রবর্তীর কাছে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে তার প্রথম লক্ষ্যই ছিল একটা ভালো চাকরী খোঁজা। ভাল গান গাইতে পারতেন, বিশেষ করে কীর্তনাঙ্গের গান। জ্যাঠামশাইয়ের অর্কেষ্ট্রা পার্টির গ্রুপ ছিল। কলকাতার বড়লোক রাড়িতে নানা অনুষ্ঠানে তাঁর দল নাটক করত। তুলসী চক্রবর্তীও সে দলে যোগ দিয়ে কীর্তন ও শ্যামা সঙ্গীত গাইতেন। পরে জ্যাঠামশাই স্টার থিয়েটারে যোগ দিলে কলকাতার রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে চিৎপুরের এক মদের দোকানে বয়ের কাজ জোটালেন। জ্যাঠামশাই খবর পেলে কাজ ছাড়তে হল।

এরপর কাজ নিলেন ঘড়ি সারাইয়ের দোকানে। সেখানে বেশিদিন মন টিকল না তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে বর্মা গেলেন। যে জাহাজে পালালেন সেটিতে বোসেস সার্কাস পার্টিও চলেছিল। সেখানেই চাকরি নিলেন। মাঝে মধ্যে শোয়ের ফাঁকে জোকারও সাজতেন। এভাবেই তিনি হাস্য-কৌতুকের প্রতি ঝোঁকেন। তুলসী চক্রবর্তী সার্কাসে থেকে কিছু খেলা যেমন শিখলেন তেমনি শিখলেন উর্দু ও হিন্দী বলতে। সার্কাসে তিনি ছয়মাস মত ছিলেন। চলে আসার কারণ জিজ্ঞাস করলে বলতেন,‘শরীর থেকে জন্তু জানোয়ারের গন্ধ বেরচ্ছে দেখে চলে এলুম।’ অ্যান্ড্রু রবিনসন ‘পরশপাথর’-এ তুলসী চক্রবর্তীর অভিনয় সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘Chakravarti recalls Chaplin to his best. Instead of moustache, he has a pair of eyes as bulbous as a frog’s which he opens wide with every emotion known to man.’

জ্যাঠামশায়ের ছাপাখানায় থিয়েটারের হ্যান্ডবিল ও পোস্টার ছাপা হত। তা দেখে তাঁর অভিনেতা হতে ইচ্ছে হয়। জ্যাঠামশায়কে অনেক অনুরোধ করায় তিনি স্টার থিয়েটারে অপরেশ মুখোপাধ্যায়ের সাহায্যে কাজে ঢোকালেন। সালটা ছিল ১৯১৬। এই অপরেশবাবুই তালিম দেন তুলসী চক্রবর্তীকে। টপ্পা গান, পাখোয়াজ বাজানো সব শিখেছিলেন। ধিরে ধিরে তিনি ‘থেটার’ করার সুযোগও পেলেন। ১৯২০ তে প্রথম ষ্টেজে অভিনয় করেন। নাটকের নাম ছিল ‘দুর্গেশনন্দিনী’। ১৯২৭ সাল পর্যন্ত তিনি ষ্টার থিযেটারেই ছিলেন। পরে যোগ দেন, মনমোহন থিয়েটারে। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪২টি নাটকে অভিনয় করেন। শেষ নাটক ছিল- শ্রেয়সী ( ১৯৬০)। তার পর তাঁর শারীরিক অসুস্থতার জন্য ( হৃদযন্ত্র) আর নাটকে অভিনয় করেন নি। মঞ্চে অভিনয় তিনি চুটিয়ে উপভোগ করতেন।

তুলসী চক্রবর্তীর সিনেমায় কাজ শুরু ১৯৩২সালে নিউ থিয়েটারের ‘পুনর্জন্ম’ সিনেমায়। পরিচালক ছিলেন সাহিত্যিক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী। তাঁর শেষ সিনেমা মৃত্যুর আঠারো বছর পর মুক্তি পায় ১৯৭৯সালে ‘আমি রতন’।‘শুভদা’য় এক গাঁজাখখোড়ের ভূমিকায় অভিনয় করার সময় স্বকন্ঠে গান করেছিলেন। অনেকদিন কাজ পাচ্ছেন না। এমন সময় সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’ ছবির কাজ। হিরো তিনিই। তুলসী চক্রবর্তী অসম্ভব কম পারিশ্রমিক চান। সত্যজিৎ রায় জানিয়েছিলেন তিনি তার ছবির নায়ককে এত কম টাকা দিতে পারবেন না। ওই ছবিতেই দর্জি তাঁর পাঞ্জাবির মাপ নিতে আসছে নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য, তিনি আপ্লুত হয়ে বলছেন, ‘’উফ! এ আমি কখনও ভাবতেও পারিনি!’’ ‘পরশপাথর’-এ অভিনয়ের সুযোগ পেলে বন্ধু মহলে বলেছিলেন,‘’আমি ছবির নায়ক, বিশ্বেস হচ্ছে না গো!’ সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘পরশপাথর’ মুক্তি পায় ১৯৫৮সালে।

পাশাপাশি সাড়ে চুয়াত্তর’, ‘চাওয়া পাওয়া’, ‘একটি রাত’-তিনটি সিনেমায় কোথাও তিনি মেস মালিক, হোটেল মালিক, সরাইখানা-কাম-ধর্মশালার মালিক-সবকটি চরিত্রে তার স্বকীয়তা বজায় আছে। কখনও অভিনয় এক ছাঁচের হয়ে যায় নি। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ’-এ গ্রামের বাড়িতে গিয়ে খালি গায়ে পৈতে পরিমার্জনার দৃশ্য প্রসঙ্গে পরে বলেছিলেন,‘পরিচালক নির্মল দে আমায় বলেছিলেন-আপনি বাড়িতে যেমন করেন, তেমনই করবেন। তাই-ই করেছি।’ এই সিনেমায় মলিনা দেবীর সঙ্গে জুটি বেঁধে দারুন অভিনয় করেন। তাঁর কাঠ-ঘটির ‘‘কই, কোথায় গেলে গো!’’-ডাক যেন এখনও কানে বাজে।

তিনি ৩১৬টি বাংলা ও ২৩টি মত হিন্দী সিনেমা করেন। তবে জীবনে সব থেকে বেশি আনন্দ পান সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’-এ অভিনয় করে। ছবি রিলিজের সময় তুলসী চক্রবর্তী কেমন উদ্‌ভ্রান্তের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘এইবারে আমি নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যাব। বড় বড় হোর্ডিংয়ে ইয়া বড় বড় মুখ আমার। জীবনে তো কখনও এত বড় বড় মুখ হোর্ডিংয়ে দেখিনি। এর আগে যাও বা দু-চারবার হয়েছে, তা সে সব মুখ তো দুরবিন দিয়ে খুঁজে বার করতে হত। এ আমি কী হনু রে!’

‘পরশপাথর’ ছাড়া তিনি সে ভাবে আর কোনও সিনেমায় বড় চরিত্র পাননি। তবে নীরেন লাহিড়ীর ‘ভাবীকাল’ ও ফণী বর্মার ‘জনক নন্দিনী’তে সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করেন। যদিও এ সিনেমাগুলির প্রিন্ট এখন আর পাওয়া যায় না।’ উত্তমকুমার অভিনীত প্রায় তিন ডজন সিনেমায় তুলসী চক্রবর্তী অভিনয় করেছেন। উত্তমকুমার বলতেন,’‘তুলসীদা যেভাবে অভিনয় করেন, আমি তো কোন দিনই পারব না। ওঁর মতো ‘জীবন্ত’ হয়ে ওঠা আমার দ্বারা হবে না।

আমৃত্যু তুলসী চক্রবর্তী সিনেমায় কমেডিয়ান হয়েই বেঁচে ছিলেন। ‘পরশপাথর’-এর পরও। সেই সঙ্গে দারিদ্র ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সংসার পাতেন স্ত্রী ঊষারানী চক্রবর্তীর সঙ্গে ২নং কৈলাস বসু থার্ড লেন-এ, মধ্য হাওড়ার এক সংকীর্ণ গলির দু’কামরার দোতলা বাড়িতে। ঘরে আসবাব বলতে ছিল একটি প্রাচীন পালঙ্ক, একটি কাঠের আলমারি, গোটা কয়েক টুল আর একটা ইজি-চেয়ার। অবসর সময়ে ঘরেই বসাতেন সংগীতের আসর। তাঁর কিছু গান স্রচিতও ছিল।

এই দোতলাবাড়ি যাওয়ার আগে তিনি একটা ‘বারো ঘর, এক উঠোন’-এ ভাড়া থাকতেন। দোতলা বাড়িটা যখন ছ’হাজার টাকায় কেনেন তাঁর স্ত্রী তখন তাকে তার জমানো বেশ কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা পেয়ে তিনি যেমন অবাক হন, তেমনি ভয়ও পান। কারণ তাঁর স্ত্রীর কাছে টাকা কি ভাবে এল ভেবে পাচ্ছিলেন না। তিনি অল্প রেটে যা কাজ করে পেতেন বাড়ি ফিরেই স্ত্রী’কে দিতেন, তাতেই সংসার চলতো। স্ত্রী যে তার থেকে জমাতে পারেন ভাবতেই পারেন নি। তবু বাড়ি কেনার সময় স্ত্রীকে বলেছিলেন, কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে ‘বাপের বাড়ি থেকে দিয়েচে।’ শুনে স্ত্রী হেসেছিলেন। কারণ বিধবা মা বিয়েই দিয়েছিলেন গোটা দু-তিনটে শাড়ি সম্বল করে।

সাহিত্যিক শংকর তাঁর ‘মানব সাগর তীরে’বইতে লিখেছেন,‘যদি তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, নৃপতি চ্যাটার্জির মতো অভিনেতা বিদেশে জন্মাতেন, তা হলে তাঁদের স্মরণে এক-একটি সরণি থাকত।’ তুলসী চক্রবর্তীর স্মরণে হাওড়ার মানুষ তাঁর নামে একটি পার্ক গড়ে তুলেছেন। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে অসুস্থ হয়ে পরেন। পয়সাও ছিল না চিকিৎসার জন্য। প্রচণ্ড দারিদ্র তো ছিলই, তার ওপরে নিজের বাড়ীটা দান করেছিলেন এলাকার দরিদ্র পুরোহিতদের জন্য।খানিকটা সেরে উঠেই বাজারে গিয়ে একদিন কিনে আনলেন গলদাচিংড়ি, ফুলকপি, কড়াইশুঁটি। রাতে রান্না হল, খেয়ে শুলেন। ভোররাত থেকে শুরু হল ভেদবমি। ভোরে ডাক্তার আসতে না আসতেই সব শেষ। ১৯৬১-র ১১ই ডিসেম্বর তিনি চলে গেলেন অনন্তলোকে। স্ত্রী উষারাণী দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন একমুঠো খাবারের জন্য। দারিদ্রের কারণে স্বামীর সবকটি মেডেল বিক্রী করতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবে ৩৫ টা বছর কাটিয়েছেন। মারা যাবার পর সরকারের তরফ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোরও কোনও বন্দোবস্ত ছিল না তখন। প্রাপ্তি ‘পরশপাথর’।

পপ্রশ্ন অনেক: চতুর্থ পর্ব

বর্ণ বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন, তার সমাধান কী শুধুই মাঝে মাঝে কিছু প্রতিবাদ