আগরতলা: মিজোরাম সীমান্তের লাগোয়া উত্তর ত্রিপুরা জেলার কাঞ্চনপুর ও পানিসাগরে উদ্বাস্তু ব্রু (রিয়াং) জনজাতির পুনর্বাসন ইস্যুতে রক্তাক্ত শনিবারের পর সময় কাটলেও ভয় কাটেনি। আন্তঃরাজ্য সীমানার জম্পুই পাহাড় জুড়ে আতঙ্ক। নতুন করে সংঘর্ষের খবর না এলেও থমথমে পরিস্থিতি।

শনিবার এই এলাকায় ব্রু জনজাতির পুনর্বাসন ঘিরে স্থানীয় বাঙালি ও কিছু সংগঠনের ডাকা বনধে হিংসাত্মক চেহারায় শোরগোল উত্তর পূর্ব ভারতে। বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে আক্রান্ত ত্রিপুরা স্টেট রাইফেলস( টিএসআর), পুলিশ গুলি চালায়।

শ্রীকান্ত দাস নামে একজনের মৃত্যু হয়। শনিবার রাতেই আগরতলা জিবি (গোবিন্দ বল্লভ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দমকলকর্মী বিশ্বজিত দেববর্মার মৃত্যু হয়। বিশ্বজিতবাবুর উপর হামলা চালানো হয়েছিল। তিনি গুরুতর জখম হয়েছিলেন। এছাড়াও একাধিক পুলিশকর্মী জখম হয়েছেন। পুলিশের গুলিতে জখম ৫ জনের চিকিৎসা চলছে।

ব্রু বা রিয়াং শরণার্থী সমস্যা সমাধানে সরকার স্বৈরতান্ত্রিক ভূমিকা নিয়েছে এমনই অভিযোগ করে বিবৃতি দিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বিরোধী নেতা মানিক সরকার। তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, খোদ রাজ্যের প্রাক্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সুদীপ রায় বর্মণ সরকারের কাছে চিঠি লিখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সদিচ্ছা প্রকাশে আহ্বান জানান। মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব ইতিমধ্যেই ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্ত নির্দেশ দিয়েছেন।

বিভিন্ন ইস্যুতে হেভিওয়েট বিজেপি নেতা সুদীপ রায় বর্মণ বারবার রাজ্য সরকারের সমালোচনায় মুখর। তাঁর নেতৃত্বে অন্তত ২৮ জন বিজেপি ও শরিক আইপিঅফটি বিধায়ক সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দিল্লিতে এই বিদ্রোহী বিধায়কদের নিয়ে বৈঠক করেন। তাতে সুদীপবাবু সহ বাকি মন্ত্রী ও বিজেপি বিধায়করা জানান, অতি দ্রুত মুখ্যমন্ত্রী কে না সরালে দল রাজ্য থেকে মুছে যাবে।

সূত্রের খবর, চলতি মাসেই বিজেপি সর্বভারতীয় স্তরে মুখ্যমন্ত্রী পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে চলেছে। এরই মাঝে ব্রু শরণার্থী সমস্যা ঘোরালো আকার নিয়ে ফেলল।

রাজ্যে গত বিধানসভা নির্বাচনে টানা দু দশকের বাম সরকারের পতন হয়। বিজেপি ও আইপিএফটি জোট ক্ষমতায় আসে। অভিযোগ, প্রতিশ্রুতি মতো মিজেরাম থেকে গোষ্ঠী সংঘর্ষে বিতাড়িত ব্রু জাতির পুনর্বাসন নিয়ে সরকার উদ্যোগী হয়নি। এই ইস্যুতে গত এক সপ্তাহ ধরে ত্রিপুরা-মিজোরাম সীমান্ত এলাকা গরম।

উত্তর ত্রিপুরা জেলার কাঞ্চনপুরে গত ২৩ বছর ধরে বাস্তুচ্যুত ব্রু-রা শরণার্থী হয়ে আছেন। তারা মিজোরামে ফিরতে চান, কিন্তু পড়শি রাজ্য নিতে নারাজ। আর ত্রিপুরাতেও পাকাপোক্ত থাকার ব্যবস্থার নেই। প্রায় তিরিশ হাজার ব্রু জনজাতি কে পাকাপাকি রাখলে স্থানীয় বাঙালি ও ত্রিপুরি জনগোষ্ঠীর উপর চাপ বাড়বে। এই দাবি তে ব্রু পুনর্বাসনের বিরোধিতায় সরব কাঞ্চনপুর মহকুমার বাঙালি সহ কয়েকটি সংগঠন।

স্থানীয়দের ডাকা বনধের ব্যাপক প্রভাবে এই এলাকা প্রায় প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে গিয়েছে। লাগাতার বনধে অসম-ত্রিপুরা-মিজোরামের মধ্যে যাতায়াত বন্ধ। বনধ সমর্থনকারীদের দাবি, কোনওভাবেই ব্রু শরণার্থীদের পাকাপাকিভাবে মেনে নেওয়া হবে না।

বনধ ঘিরে বিক্ষিপ্ত হিংসা শনিবার চরমে ওঠে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশের ভূমিকা ছিল আক্রমনাত্মক। তাই পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। পুলিশের গুলি চালনা ও মৃত্যুর ফলে হিংসা আরও ছড়ায়। সরকারের এই ভূমিকায় সরব বিভিন্ন সংগঠন। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রীকে সরানোর।

খোদ সুদীপ রায় বর্মণ তাঁর চিঠিতে কড়া সমালোচনা করেছেন প্রশাসনের। অবিলম্বে সরকার ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বৈঠক করে দ্রুত সবকিছু নিয়ন্ত্রণের দাবি করেছেন তিনি।

গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে সুদীপ রায় বর্মণ কংগ্রেস ছেড়ে প্রথমে তৃণমূল কংগ্রেস ও পরে বিজেপি তে যোগ দেন। তাঁর সূত্র ধরেই বিজেপি ত্রিপুরায় প্রথমবারের জন্য সরকার গড়ে। সরকারের প্রধান মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এরপর থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে বিপরীত মেরু বেছে নিয়েছেন প্রাক্তন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী সমীররঞ্জন বর্মণের পুত্র।

সপ্তম পর্বের দশভূজা লুভা নাহিদ চৌধুরী।