মানব গুহ, কলকাতা: রাম তুমি কার ? সবুজ না গেরুয়ার ? তৃণমূলের না বিজেপির ? আক্ষরিক অর্থেই রামনবমী দখল করতে এবার রামকে নিয়েই টানাটানি রাজ্যের দুই রাজনৈতিক দলের।

২৫ শে মার্চ রামনবমী। আর রামের জন্মদিনের উৎসবকে নিজেদের দখলে রাখতে জোর টক্কর শুরু হয়েছে বিজেপি বনাম তৃণমূলের। গেরুয়া সবুজের এই যুদ্ধ ছড়িয়ে গেছে কলকাতা সহ গোটা রাজ্যেই।

সারা রাজ্যেই দুই দলের রামনবমীর ব্যানার পোস্টারে মুখ ঢেকেছে রাজপথ থেকে কানা গলি। তবে এক্ষেত্রে গেরুয়াকে টেক্কা দিয়েছে সবুজ। স্বাভাবিকভাবেই শাসক দলের খরচা করার ক্ষমতা বেশি থাকারই কথা। তাই, মমতা আর অভিষেকের ছবি দিয়েই রামনবমীর প্রচার যুদ্ধে এই মূহুর্ত্বে অনেকটাই এগিয়ে তৃণমূল।

তবে পিছিয়ে নেই বিজেপিও। ইতিমধ্যেই রামনবমী নিয়ে হুঙ্কার ছেড়েছেন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। রাজ্য প্রশাসন অস্ত্র নিয়ে রামনবমীর মিছিল নিষিদ্ধ করার পরেও, অস্ত্র হাতেই রামের জন্মদিনে মিছিল হবে বলে প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ করে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।

অন্য দিকে ত্রিপুরায় ২৫ বছরের বাম শাষণ শেষ করার পর এরাজ্যেও পালাবদল ঘটাতে কোমড় বেঁধেছে কেন্দ্রের শাসক দল। তাই কোন ইস্যুই আর ছাড়তে রাজি নয় বিজেপি। রামনবমী এখন একটা বড়ো ইস্যু। গতবছরও রামের জন্মদিনকে কেন্দ্র করে খবরে এসেছিল গেরুয়া শিবির৷ মহিলা ও শিশুদের হাতে অস্ত্র দেখে বিতর্কে জড়িয়েছিল সব রাজনৈতিক দলই৷ এইবছর রাজ্য প্রশাসন অস্ত্র হাতে মিছিল নিষিদ্ধ করার পর এই ইস্যুতে গোটা রাজ্যেই বড়ো করে আন্দোলন করতে উদ্যোগী তারা।

আর তাই, বিজেপির সেই পরিকল্পনায় জল ঢালতে অনেক আগে থেকেই উঠে পড়ে লেগেছে রাজ্যের শাসক দল। রামনবমীর সমস্ত আলো, প্রচার বিজেপি র হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে গোটা রাজ্যেই প্রচারে নেমেছে মমতার তৃণমূল। রামনবমী ও একই সঙ্গে নতুন বছরের শুভেচ্ছায় রাজ্যের সব রাস্তা আর পাড়ার মোড় ঢেকে দিয়েছে তারা।

সাধারণত, হিন্দুদের আচার অনুষ্ঠান হলেও রাজনৈতিক দলের দিক থেকে যদি দেখা যায়, তাহলে রামনবমী বরাবরই হিন্দুত্ববাদী দলগুলিই বড়ো করে পালন করে আসছে। তবে গত কয়েক বছর ধরে বাংলা দখল করতে প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিজেপি যেভাবে এই অনুষ্ঠান পালন করছে, সেটাও আগে দেখা যায় নি।

তবে, ‘বিজেপির রামনবমী’ যেভাবে এবছর অনেক আগে থেকেই তৃণমূল হাইজ্যাক করার চেষ্টা করছে, সেটাও অভূতপূর্ব। রামনবমীর প্রচারে এবার যে রাজ্যের শাসক দল অনেক এগিয়ে গেছে সেটা অস্বীকারের কোন রাস্তা নেই। যত দিন এগিয়ে আসবে তত এই প্রচারের লড়াই বাড়বে তা বলাই যায়।

তবে তৃণমূল কংগ্রেস, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি দিয়ে রামনবমীতে মানুষকে শুভকামনা জানালেও, বিজেপি কিন্তু এখনও পর্যন্ত শুধু রামের ছবি দিয়েই শুভেচ্ছার কাজ সেরেছে। তারা এবার রামের পাশে কোন নেতার ছবি লাগাবার সিদ্ধান্ত এখনও নেয় নি৷

বাংলার মানুষ রামকে নিয়ে তৃণমূল বনাম বিজেপির এই লড়াইয়ে বেশ মজা পাচ্ছেন। রসিক বাঙালি তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন এই রাম দখলের লড়াই। রাম তুমি কার ? ট্রেণে, বাসে, পাড়ার চায়ের ঠেকে হাসির সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন তারাই।

কলকাতার পাটুলি থেকে জঙ্গলমহলের পুরুলিয়া, বর্ধমান থেকে বহরমপুর সর্বত্রই তৃণমূলের রামনবমীর প্রচারে পিসি-ভাইপোর মুখ৷ প্রচারে প্রচারে বিজেপিকে রামনবমীতে ব্যাকফুটে পাঠানোর কাজটা অনেকটাই সেরে ফেলেছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ বিজেপির প্রচারে সেখানে শুধু রামই ভরসা৷ প্রচারে কলকাতা ও জেলায় অনেকটাই পিছিয়ে৷ তবে, ‘ওস্তাদের মার শেষ রাতে’ ভাবভঙ্গি করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কলকাতা ও জেলার বিজেপি নেতারা৷ আর এখানেই প্রমাদ গুণছেন ছাপোষা বাঙালি৷

মহাভারতে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে টানাটানি পড়ে গিয়েছিল পাণ্ডব ও কৌরবদের মধ্যে। রাধামাধবের পায়ের কাছে বসে অর্জুন সেক্ষেত্রে টেক্কা দিয়েছিলেন মাথার কাছে বসে থাকা দুর্যোধনকে। বাংলায় সত্যি করে রামের ‘পদসেবা’ অর্থাৎ শান্তির রাস্তায় কোন দল হাঁটছে, কারা রাজনৈতিক যুদ্ধে রামকে দখল করে সাফল্য পান, তার জন্যই এখন অপেক্ষা। তবে কুরুক্ষেত্রের মত বাংলাতেও সেই যুদ্ধে রক্ত ঝড়বে না তো ? প্রচারের যুদ্ধ শুরু হতেই, আসল যুদ্ধের আগে রীতিমত আশঙ্কায় আপামর বাংলাবাসী।