সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘শত শত চোখ আকাশটা দেখে, শত শত শত মানুষের দল। যশোর রোডের দুধারে বসত বাঁশের ছাউনি কাদামাটি জল। কাদামাটি মাখা মানুষের দল, গাদাগাদি করে আকাশটা দেখে, আকাশে বসত মরা ঈশ্বর, নালিশ জানাবে ওরা বল কাকে? ঘরহীন ওরা ঘুম নেই চোখে, যুদ্ধে ছিন্ন ঘর বাড়ী দেশ, মাথার ভিতরে বোমারু বিমান, এই কালোরাত কবে হবে শেষ।’

একাত্তরের সেই যুদ্ধ নিয়ে তৈরি বিখ্যাত ‘যশোর রোড’ গানের লাইনের মতোই অবস্থা উত্তর ২৪ পরগনার। অংশ হিসাবে আবারও তেমনই অবস্থা হতে পারত যশোর রোডের। কিন্তু তা হয়নি। আগলে রেখেছে শতাব্দী প্রাচীন গাছ। এমনটাই জানাচ্ছে যশোর রোড গাছ বাঁচাও কমিটির সদস্যরা।

কমিটির সদস্যদের অন্যতম সৌভিক মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ‘ ‘আমফান’ ঝড়ে ভেঙ্গে পড়েছে বহু বাড়ি, উড়ে গেছে ঘরের চালা। সকাল থেকে মেরামতির কাজ চলছে সব অঞ্চলে। তবে যশোর রোডে হাবড়া অশোকনগর পার্টে বেশ কিছু ডাল ভেঙ্গে রাস্তা ঘাটে পড়ে থাকলেও মোটা বড় গাছ গোড়া থেকে ভাঙা চোখে পড়েনি। হয়তো এটা পুরো ছবি নয়। তবে যে শতাব্দী প্রাচীন গাছ গুলি কাটার জন্য ছিল এত তোড়জোড়, এত এত লোভী চোখ ছিল যাদের ঘিরে, ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে সেগুলি ক্লান্ত শরীরে ক্ষতবিক্ষত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে।

আর তার আশে পাশে বহু সিমেন্টের ইলেকট্রিক পোল, হাইটেনশন তার, ট্রান্সমিটার সব উপরে পড়েছে ঝড়ের বেগ সামলাতে না পেরে। ‘

গাছ যোদ্ধাদের কথায়, ‘হাবড়া বিডিও অফিসের উল্টো দিকে গাছ বাড়ির গাছের বেশ কিছু ডাল পড়ে রাস্তার একটি অংশে আটকে। মোটা বট গাছটি গোড়া থেকে ভাঙেনি, গাছটা বাঁচবে। অশোকনগর নবজীবন পল্লীর মুখে ইলেকট্রিক পোল,গাছ,তার,ট্রান্সমিটার পড়ে আপাতত রাস্তা বন্ধ। তার আগে কিছু ছোট লরি দাঁড়িয়ে থাকায় অনুমান করা যায় সেই পর্যন্ত রাস্তা ফাঁকা। এছাড়া বেশ কিছু ছোট বড় ডাল, প্রচুর গাছের পাতা রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে ঝড়ের স্বাভাবিক কারনে।’

সৌভিক জানাচ্ছেন , ‘শুধু যশোর রোডে না, সর্বত্র, আমফানের সাথে লাগাতার যুদ্ধ করেছে বহু বড় বড় গাছ, টিকিয়ে রেখেছে বহু বাড়ি, অসংখ্য জীবন। এত গাছ না থাকলে ঝড়ে যে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যেত, ভেঙ্গে তছনছ করে দিত সব তার ঠিক ছিলনা।’

কমিটির পক্ষে জানানো হয়েছে, :যশোর রোড জুড়ে স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি যাতে যত দ্রুত সম্ভব গাছের ডাল সরিয়ে ভেঙে যাওয়া ইলেকট্রিক পোল, কারেন্টের তার মেরামতির কাজ শুরু হয়। দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়। আমরাও আমাদের সাধ্যমত সে চেষ্টা করছি।  কিন্তু প্রশাসনের দায় এড়ানোর সময় এটা নয়। ‘ আকাশ আস্তে আস্তে পরিস্কার হচ্ছে, আশে পাশে ঠুকঠুক ঘরের চাল মেরামতির শব্দ। দূরে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্ষত বিক্ষত শরীরে যশোর রোডের গাছ।

ওঁরা জানাচ্ছেন, ‘যারা এখনও ভাবছেন গাছই এই সব সমস্যার মূল, গাছ ভেঙ্গে পড়েই এত ক্ষয় ক্ষতি তারা সত্যিই মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। যেখানে গাছপালা নেই বা তুলনামূলক কম সেই সমস্ত এলাকায় এই ঝড়ে যে কি সাংঘাতিক ক্ষতি হয়েছে তা দেখলে শিউরে উঠবেন। ঝড়ের বেগে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়ে গেছে তাদের শেষ সম্বল টুকুও। যশোর রোডের গাছ গুলি পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠর মত আগলে রেখেছে আশেপাশের সব।

Proshno Onek II First Episode II Kolorob TV