তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: ফের জটিল অস্ত্রোপচার করে নজির সৃষ্টি করল বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। পরিকাঠামো না থাকা সত্ত্বেও জটিল এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রাণে বাঁচলেন প্রান্তিক পরিবারের এক মহিলা।

হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া খবরে খবরে জানা গিয়েছে, গত ১৫ জুলাই বাঁকুড়া শহর সংলগ্ন বাদুলাড়া গ্রামের বছর তিরিশের মার্জিনা বিবি দীর্ঘ ন’মাস ধরে ভুগছিলেন৷ কাশির সাথে রক্ত বের হওয়া ও পেটের ডান দিকে ব্যাথার সমস্যা নিয়ে হাসপাতালের আউটডোরে চিকিৎসার জন্য আসেন। প্রাথমিক অবস্থায় এক্সরে ও আলট্রাসেনোগ্রাফিতে লিভার ও ডান দিকের ফুসফুসে সিস্টের উপস্থিতি ধরা পড়ে। পরে সিটি স্ক্যানের পর অস্ত্রোপচার করা হয়।

অস্ত্রোপচার শেষে দেখা যায় লিভার ও ফুসফুসে সাদা ডিমের মতো সিস্ট রয়েছে। যা হাইডাটিড সিস্ট নামে পরিচিত। কুকুরের শরীরে ফিতাকৃতি জাতীয় এই সিস্টটি দেখা যায়। এই ধরণের অস্ত্রোপচারের জন্য কার্ডিও থোরাসিক বিভাগ থাকা জরুরী, যা এখানে নেই। তবুও রোগীর পারিবারিক অবস্থার কথা ভেবে ওই রোগীকে অস্ত্রোপচারের জন্য ভরতি করা হয়।

গত ২৪ জুলাই সার্জারির বিভাগীয় প্রধান ডাঃ উৎপল দের নেতৃত্বে পাঁচ জন চিকিৎসক ও তিন জন অ্যানাস্থিসিস্টের উপস্থিতিতে চার ঘন্টার এই অস্ত্রোপচার শেষ হয়। অস্ত্রোপচারে দুটি মূল সিস্ট থেকে কয়েক লক্ষ সিস্ট বের করা হয়েছে। বুকের পাঁজর ও পেট কেটে এই ধরণের অস্ত্রোপচার করতে কার্ডিও থোরাসিক বিভাগ অত্যন্ত জরুরী তা অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসকই মানছেন। তবে তা না থাকা সত্ত্বেও এই জটিল অস্ত্রোপচার বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে হওয়ায় খুশির হাওয়া সব মহলেই।

হাসপাতালে বেডে বসে মর্জিনা বিবি বলেন, আমি কোন দিন ভাবিনি আবারো সুস্থ হব। তবে এখন অস্ত্রোপচারের পর অনেকটাই সুস্থ। গত ন’মাসের বেশী মূলত কাশির সমস্যায় ভুগছিলেন বলে তিনি জানান।

রোগীর আত্মীয়া আনোয়ারা খাতুন বলেন, বাইরে চিকিৎসা করানোর কোন সামর্থ্য আমাদের ছিলনা। বাড়িতে ছ’জন সদস্য, ভাইয়ের রোজগারে সংসার চলে। এখানে এই রোগের চিকিৎসা হওয়ায় তারা অনেকটাই ভারমুক্ত হলেন বলে তিনি জানান।

এই জটিল অস্ত্রোপচারের নেতৃত্বে থাকা ডাঃ উৎপল দে বলেন, ঐ রোগীর স্বামী বাঁকুড়া গোবিন্দ নগর বাসস্ট্যাণ্ডে পাউরুটি বিক্রি করে সংসার চালান। আর্থিক দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। এই চিকিৎসা বাইরের কোন বেসরকারি হাসপাতাল থেকে করালে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা খরচ হত। যা করার সামর্থ্য ওনাদের ছিলনা বলেই তিনি জানিয়েছেন।

বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডাঃ পার্থ প্রতিম প্রধান বলেন, ঐ অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় বিভাগ এখানে না থাকলেও দক্ষ চিকিৎসক ও অ্যানাস্থিসিস্ট এখানে আছেন। তাছাড়া গত কয়েক বছরে এই হাসপাতালের পরিকাঠামো গত অনেক উন্নতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এই ধরণের অস্ত্রোপচারে যে ধরণের যন্ত্রপাতি দরকার তা আনানো হয়েছে। ফলে কার্ডিও থোরাসিক বিভাগ না থাকা সত্ত্বেও এই ধরণের বুক কেটে অস্ত্রোপচার আমরা এখানে করছি, রোগীরাও সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। রোগীর পরিবারের আর্থিক অবস্থার কথা ভেবেই আমরা এই অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নিই। ঐ রোগী বর্তমানে সুস্থ আছেন, কিছু দিনের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।