সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: যশ খ্যাতির মোহের পিছনে মানুষ দৌড়য় অথচ সেটাই তাঁকে কতটা বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে তা আদৌ সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না৷ ১৯৬৬ সালে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালিত ‘নায়ক’ ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল৷ ছবিতে উত্তমকুমার অভিনীত অরিন্দম চরিত্রটি একজন রূপোলি পর্দার তারকা৷ তার পাঁচ দশক পরে সম্প্রতি কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ মুক্তি পেয়েছে ৷

এই ছবির মূল ভাবনা অকালপ্রয়াত শ্রী ঋতুপর্ণ ঘোষের৷ আর এই ছবিতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় অভিনীত ইন্দ্রজিৎ চরিত্রটিও একজন সেলিব্রিটি অভিনেতা ৷

সেদিন সত্যজিৎ রায় ওই ছবিটির মাধ্যমে দর্শকদের বোঝাতে চেয়েছিলেন একজন রূপোলি পর্দার ম্যাটিনি আইডলের ব্যক্তি জীবনটা কতটা যন্ত্রণাময়৷ সাফল্যের শিখরে থাকলেও তিনি বড়ই একা, সব সময় তাঁকে অনিশ্চয়তা তাড়া করে বেড়ায় ৷ সেলিব্রিটি হওয়ার দরুর তিনি চাইলেও আগের মতো জীবন যাপন করতে পারেন না, যারজন্য খুব কাছের মানুষের কাছেও তিনি ছোট হয়ে যান৷ তার পাঁচ দশক পরে ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ ছবিটিতে মুক্তি পেলেও উঠে এসেছে রূপোলি পর্দার এক সুপারস্টারের যন্ত্রণার কথা৷ যিনি বাবার মৃত্যুর পরে ঠিকমতো শোক করতে পারেন না কারণ ভক্তদের ভিড় তাঁকে সে সুযোগ দেয় না ৷ তার জনপ্রিয়তা মাসুল বার বার দিতে হচ্ছিল শোকের আবহাওয়াতেও৷ জনপ্রিয় নায়কের সঙ্গে ভক্তদের সেলফি তোলার হিড়িক যা শোকের পরিবেশে (কখন বাড়িতে কখনও বা স্কুলের শোকসভায়) প্রকৃত স্বজনহারাদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠছিল বার বার৷ সেটাই একেবারে ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছয় যখন ভক্তদের ভিড় এবং বিশৃঙ্খলার আশঙ্কায় তাঁর ছোট ভাই বাবার শ্রাদ্ধে তাঁকে আসতে বারণ করেন৷ ভাইয়ের কাছ থেকে এমন আর্জি আসায় চরম সাফল্যের পরেও এক শূণ্যতা এতটাই গ্রাস করে যে বেশ কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়৷

‘নায়ক’ ছবিতে সাক্ষাৎকার নিতে নিতে রূপোলি পর্দার নায়কের যন্ত্রণাটা অনুভব করেছিলেন এক মহিলা সাংবাদিক ৷ কিন্তু ‘জ্যেষ্ঠপুত্র’ এই ছবির গল্পটি মূলত সেলিব্রিটি ইন্দ্রজিতে এবং তার ছোটভাই পার্থর ( ঋত্তিক চক্রবর্তী) দ্বন্দ্ব ঘিরে ৷ যা দুই ভাইয়ের সংলাপের মাধ্যমে অবশ্যই অন্যমাত্রা দিয়েছে এই ছবিটিতে ৷ ছোট ভাইয়ের দাদার প্রতি সন্মান শ্রদ্ধা থাকলেও অভিমান কম নেই৷ তবে দাদার মতো গ্ল্যামারের জগতের বদলে সে বাবার বামপন্থী সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগী৷ সেই মতোই দেশের নাট্য আন্দোলনে ব্যস্ত থেকেছে, কখনও সে দাদাকে অনুরোধ করেনি সিনেমায় চান্স করিয়ে দেওয়ার জন্য৷ বামপন্থী মনোভাবাপন্ন হয়েও ছোটভাইয়ের নিয়ম করে অশৌচ পালন করা দেখে দাদা কটাক্ষ করলে তার যুক্তি, বাবা কমিউনিস্ট হলেও মায়ের পুজো করাতে কখনও বাধা দেননি বরং সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতেন৷ বাবার মতো মায়ের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল তিনি বুঝিয়ে দেন৷

একযুগ বাদে দাদা বাড়ি এলেও বাড়িতে থাকতে পারছেন না, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁর সঙ্গে শুধু পুলিশই পাঠানো হয়নি, থাকার জন্য ব্যবস্থা করা হয় অন্য এক গেস্টহাউসে৷ বরং পাগল বোন ইলাকে ( সুদিপ্তা চক্রবর্তী ) নিয়ে বিরক্তি থাকলেও ছোটভাই দিনের পর দিন রয়ে গিয়েছে দেশের বাড়িতে৷ যার ফলে ইন্দ্রজিৎ তথা জ্যেষ্ঠপুত্র সফল ব্যক্তি হলেও প্রকৃত সন্তান হতে পারেননি৷

এই ছবির শুরুতে বাবা কমরেড ইন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে ‘জাগো জাগো জাগো সর্বহারা’ গানটা শোনা গেল৷ বাম আমলে এই গানটা বার বার শোনার সুযোগ থাকলেও গত সাত-আট বছর তেমন আর শোনা যায় না৷ তবে ছবিতে শুধু থিয়েটার সিনেমার দ্বন্দ্ব ছাড়াও সমাজতন্ত্র এবং নয়া পুঁজির বিরোধের কথা ইন্দ্রনাথ চরিত্রের মাধ্যমে আরও কিছুটা আনলে ভাল হত৷