তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়াঃ আজ ২৩ জানুয়ারী। ভারত মাতার শৃঙ্খল মোচনে আপামর ভারত বাসীর উদ্দেশ‍্যে যিনি বলেছিলেন ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেবো’। আজ সেই মহামানব নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৫ তম জন্ম দিন।

সম্ভবতঃ ১৯৩০ সাল, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে প্রথম বাঁকুড়ার মাটিতে পা রাখেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। ঐ বছরের ৯ এপ্রিল জেলা কংগ্রেসের এক সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি কোতুলপুরে এসেছিলেন। ওখানকার গোরুহাটতলায় সেই সম্মেলনে প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন নেতাজী। আর এই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে স্থানীয় সবুজ সংঘের তরফে কোতুলপুর জয়রামবাটি মোড়ে ১৯৮২ সালে নেতাজীর আবক্ষ মূর্তি ও ঠিক তার পরের বছর ১৯৮৩ সালে ঐ জায়গাতেই পূর্ণায়ব মূর্তি স্থাপিত হয়। বর্তমানে যা ‘নেতাজী মোড়’ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে।

১৯৩০ সালের পর ফের বাঁকুড়ায় এসেছিলেন সুভাষ চন্দ্র বসু। তাঁর অন্যতম প্রিয় জায়গা লাল মাটির এই জেলা। বাঁকুড়া, খাতড়া, অমরকানন থেকে বেলিয়াতোড় সহ জেলার বিভিন্ন অংশে বেশ কয়েকটি ব্রিটিশ-বিরোধী সভা করেছেন তিনি।

একেবারে শুরুতেই দক্ষিণ বাঁকুড়ার জঙ্গল মহলে নেতাজীর পদার্পণের দিকে চোখ রাখি। ১৯৪০ সালের ২৭ এপ্রিল। জেলার একেবারে প্রান্তিক শহর খাতড়ায় সভা করবেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। এই খবরে উজ্জীবিত এখানকার তৎকালীন যুব সমাজের একটা বড় অংশ। সকলেই নিজেদের মতো করে যখন সভা আয়োজনে ব্যস্ত, অন্যদিকে ঠিক তখন ঐ সভা ভণ্ডুল করতে ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত ব্রিটিশ পুলিশও।

কিন্তু প্রধান বক্তা যেখানে নেতাজী, সেখানে সভা করতেও মরিয়া আয়োজকরা।বর্তমান ইন্দপুর-বাংলার উপর দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে খাতড়ায় এসে পৌঁছালেন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। লক্ষ্য ব্রিটিশ বিরোধী জনসভা। সেদিন খাতড়া ষোলোআনা দুর্গামেলার সামনে ঐ জনসভায় নেতাজী পৌঁছানোর আগেই ব্রিটিশ পুলিশ মাইক খুলে দেয়, মঞ্চ ভেঙ্গে ফেলে৷ কিন্তু দমবার পাত্র নন নেতাজী, দমবার পাত্র নন জঙ্গলমহলের স্বাধীনতাকামী মানুষও।

সেদিন নেতাজী সেই ভাঙ্গা মঞ্চের সামনেই হাতচোঙা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন৷ সেদিন তাঁর ভাষণের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘ব্রিটিশের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে সংগ্রামী চেতনার সম্প্রসারণ’। ঐ মহতী সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী জন্মেজয় সুবুদ্ধি। নেতাজীর ঐ জনসভায় খাতড়া হাইস্কুলের অনেক ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করেন৷

তরুণ মতিলাল মাহাতো’র নেতৃত্বে এক দল ছাত্র স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি প্যারেডে অংশ নেয়। কিন্তু নেতাজী খাতড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পর পুলিশের চাপে স্কুল কর্তৃপক্ষ ঐ ছাত্রদের শোকজ করে। নেতাজীর জনসভায় যাওয়া ও প্যারেডে অংশগ্রহণ করা অন্যায় হয়েছিল বলে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও কথিত আছে। কিন্তু মতিলাল মাহাতো সহ ৭ জন ছাত্র ঐ নির্দেশ না মানায় তাদের উপর শাস্তির খাড়া নেমে আসে।

খাতড়া থেকে ফিরে পরদিন ২৮ এপ্রিল নেতাজী সুভাষ চন্দ্র পৌঁছালেন বাঁকুড়া শহর থেকে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে অমরকাননে। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী গোবিন্দ প্রসাদ সিংহের পরম বন্ধু অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তরুণ বয়সে অকাল মৃত্যু ঘটে। বন্ধুর স্মরণে গোবিন্দ প্রসাদ স্থানীয় মাছরাঙ্গার জঙ্গলের নাম রাখেন ‘অমরকানন’। তৈরী করেন শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাদল আশ্রম। তাঁরই আহ্বানে এখানে ১৩৩২সালের ২৪ আষাঢ় এই আশ্রমের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী।

এই অমরকানকে নিয়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এখানে বসেই লিখেছিলেন ‘অমরকানন মোদের কানন/বনকে বলে রে ভাই আমাদের এ তপোবন/আমাদের এ তপোবন।’ স্বাধীনত্তোর কালে অমরকানন আশ্রম ছিল অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অন্যতম পছন্দের জায়গা।

ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে অমরকাননেরও। গোবিন্দ প্রসাদ সিংহের অত্যন্ত কাছের মানুষ সুভাষ চন্দ্র বসুও অমরকাননকে খুব ভালোবাসতেন এমনকি আশ্রমে থেকেওছেন। গোবিন্দপ্রসাদ সিংহের সাথে ছিল তাঁর পরম হৃদ্যতা। আর তাঁরই আমন্ত্রণে ঐদিন গঙ্গাজলঘাটিতে সভা করেন নেতাজী। সভা মঞ্চে নেতাজীকে বসার জন্য বিশেষ সোফার ব্যবস্থা করেছেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু তিনি সভা মঞ্চে উঠে সেই সোফা সরিয়ে দিয়ে টেনে নিয়েছিলেন অন্যান্য নেতাদের জন্য মঞ্চে রাখা কাঠের চেয়ার।

আর তাতেই বসেন তিনি। ঐ সভায় যে কাঠের চেয়ারটিতে নেতাজী বসেছিলেন, তা আনা হয়েছিল স্থানীয় দেশুড়িয়া গ্রামের চিকিৎসক রামরূপ কর্মকারের চেম্বার থেকে । সভা শেষে সুভাষ চন্দ্র বসু সেখান থেকে রামহরিপুরের রাস্তা ধরে বেলিয়াতোড়ের দিকে যান। এরপরই কাঠের ওই চেয়ারকে মাথায় করে দেড় কিলোমিটার দূরে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান চিকিৎসক রামরুপ কর্মকার স্বয়ং। তখন থেকেই নেতাজী স্পর্শ পাওয়া ঐ চেয়ার তাঁর ঠাকুর ঘরে রাখা হয় ।

তারপর পাশের শালী নদী দিয়ে বয়ে গেছে অনেক জল। কালের নিয়মে প্রয়াত হয়েছেন চিকিৎসক রামরূপ কর্মকার । কিন্তু নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর স্পর্শধণ্য সেই চেয়ার দেশুড়িয়া গ্রামের কর্মকার পরিবারে আজও সযত্নে রয়ে গেছে ঠাকুর ঘরেই । প্রতি বছর ২৩ জানুয়ারী নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মদিনে ঐ বিশেষ চেয়ারে রাখা হয় তাঁর প্রতিকৃতি। ফুল, মালা দিয়ে নেতাজীকে আজও শ্রদ্ধা জানান কর্মকার পরিবারের মানুষ।

১৯৪০ এর ঐ বাঁকুড়া সফরে খাতড়া, অমরকানন, গঙ্গাজলঘাটি, বাঁকুড়া শহর, বিষ্ণুপুরেও একাধিক সভায় তিনি যোগ দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়। স্বাধীনত্তোর সময়কালে অসংখ্য, অসংখ্য বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সাক্ষী থেকেছে লাল মাটির জেলা বাঁকুড়া। যার মধ্যে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কাণ্ডারী, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের পদধূলি ধন্য এই জেলা। যা বাঁকুড়াবাসীর কাছে কাছে অত্যন্ত গৌরবের, আনন্দেরও।

লাল-নীল-গেরুয়া...! 'রঙ' ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা 'খাচ্ছে'? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম 'সংবাদ'! 'ব্রেকিং' আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের। কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে 'রঙ' লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে 'ফেক' তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই 'ফ্রি' নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.

জীবে প্রেম কি আদৌ থাকছে? কথা বলবেন বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞ অর্ক সরকার I।